গ্যালারি

আড্ডাঃ মঞ্চ নাটক ‘নিত্যপুরাণ’ ও কিছু কথা


গত কিছুদিন আগে শিল্পকলা একাডেমীতে মঞ্চ নাটক নিত্যপুরাণ দেখলাম। আমি মঞ্চ নাটক খুব পছন্দ করি, বলে রাখা ভাল আমি নিজেও একবছরের নাটকের (সামষ্টিক সব কিছু) একটা কোর্স করেছিলাম, থিয়েটার স্কুলে। অভিনয়ের চেয়ে আমার ব্যাক ষ্টেজে কাজ করতে ভাল লাগত। তবে আমি নিজে সেই সুযোগ কাজে লাগাই নাই, কারন এটা একটা সুদুর পরাহত বা সাফল্য দুরাহত ব্যাপার। মঞ্চ শুধু চর্চা চায়, এবং এই চর্চার সাথে বাকী কিছু থাকে না। মঞ্চে কাজ করে করে নিজকে এমন একটা পর্যায়ে নিজকে নিয়ে যেতে হয় যে, মঞ্চে উঠলেই যেন শরীর তেমনি হয়ে পড়ে।

আমি মনে করি, মঞ্চে নাটক বা অভিনয় করা সহজ কাজ নয়। মঞ্চে কিছু করে নিজকে তুলে ধরা দুনিয়ার অনেক কাজের চেয়ে কঠিন একটা কাজ, এটা যারা এই মঞ্চের সাথে জড়িত তারাই বুঝতে পারেন। বর্তমান দুনিয়ায় মঞ্চে কাজ করার লোক কমে যাবার পিছনে এই রকম নানান কারন আছে। তাছাড়া, মঞ্চ নাটকের ভবিষ্যৎ এই দেশে নাই বলা চলে। আমি সেই ২০০০ সালের দিকে ছেড়েছি, তখন থেকেই দর্শক নাই হতে থাকে এবং বর্তমানে তো ফ্রী দিয়েও দর্শক নেয়া যায় না! আর মঞ্চে যারা কাজ করেন তাদের আর্থিক অবস্থাও ফেরানোর চিন্তা করা যায় না! এটা নেহাত মানুষের একটা শখের জায়গা হয়ে গেছে এখন।

হ্যাঁ, সত্য কথা বলেই ফেলি, আমি আর্থিক কারনেই আর মঞ্চ মুখি হই নাই! বিবাহের পর আমি পরিস্কার বুঝতে পারি, পরিবার বাঁচাতে আমাকে অর্থই উপার্জন করতে হবে এবং সেটা ফ্লুয়েন্টলি হতেই হবে। আমি এই ভয়ে আর মঞ্চ মুখি হই নাই, মঞ্চে আমার যে ব্যাক ষ্টেজে কাজ করার ইচ্ছা ছিল সেটা আমি পরিত্যাগ করি, আমি দূর্বল মনের মানুষ! স্ত্রী সন্তান অর্থের অভাবে পড়বে এটা আমি কখনো চাই নাই! যাই হোক, কথা গুলো ইচ্ছা করেই লিখে ফেললাম, জীবনে কত কি করার কথা ছিলো, কত কি করেছি এবং বিবাহের পর মুলত টার্গেট একটাই ‘অর্থ’! আমি বুঝে গেছি অর্থ ছাড়া পরিবার বাঁচবে না!

নিজের ব্লগ, নিজের মত করে কথা বলা যায়! হা হা হা, আমি মুলত আজ মঞ্চ নাটক নিয়ে সামান্য কথা বলার জন্য বসেছি! নিত্যপুরাণ দেখার অভিজ্ঞতা বলতে চাই! এই নাটকের নাট্যকার জনাব মাসুম রেজা, তিনি অনলাইনে আমার ফেইসবুকের বন্ধু (বাস্তবে দেখা হয় নাই) এবং আমি তার স্ট্যাটাস পড়ি নিয়মিত। এই নাটক দেখার পিছনে তার দেয়া স্ট্যাটাস কাজ করেছে, তার স্ট্যাটাস দেখেই আমি আগ্রহী হয়েছিলাম। নাটক দেখার পরে মনে হয়েছে, তিনি এই সময়ের সব চেয়ে বেশী জনপ্রিয় মঞ্চ নাটক লেখক এবং পরিচালক। আমি তার আরো আরোও সাফল্য কামনা করি।

নিত্যপুরাণ নাটক মুলত প্রাচীন পৌরনিক গল্পের মাধ্যেমে একটা আধুনিক গল্প বা উপস্থাপনা। পৌরনিক বা মাইথোলজিক্যাল কাহিনী গুলোর উপর আমার জ্ঞান সামান্য এবং এই বিষয়ে আমার তেমন ভাল পড়াশূনা নেই, এই বিষয় মুলত অনেক বড় বিষয়। শিল্প ও সাহিত্যে এই সকল ঘটনা, গল্প বা কাহিনী গুলো একটা আলাদা স্থান দখল করে আছে। আমি খুব অল্প বা সামান্য কথায় এই নাটকের কাহিনী বলে দিচ্ছি, তবে এই নাটক সত্যই দেখার বিষয় এবং আপনি না দেখলে বুঝতে পারবেন না যে গল্প কাকে বলে, নাটক কাকে বলে? নাট্যকার প্রায় সময় বলেন, এই নাটক দেখলে আপনি মনে আনন্দ পাবেন, হ্যাঁ, আমি স্বীকার করে নিলাম। টানা পনে দুই ঘন্টা আমি নিজেই মন্ত্রমুগ্ধ্বের মত এই নাটক উপভোগ করেছি। আমার সাথে আমি এক বন্ধু নিয়ে গিয়েছিলাম, সেও আমার সাথে একমত হয়েছে।

নাটকের কাহিনী সামান্য তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না! আমি আমার ভাষাতেই বলছি। শহরে একজন নিন্ম বর্নের যুবকের আবির্ভাব, সে সর্ব বিদ্যায় নিজকে যোগ্য করে তুলেছে, তার একজন শিক্ষক আছে, শিক্ষকের আদেশ তার কাছে শিরোধার্য্য। সে নিজকে পঞ্চ পান্ডবের (পাঁচ জন যুবক, একই যুবতির পাণীপার্থী) সম ভাবে এবং তাদের সাথে তার চ্যালেঞ্জ হয়, সে নিজকে সেই উচ্চতায় নিতে চায়। নানান ঘটনায়, নানান পরীক্ষায় সে উত্তীর্ন হয় এবং পঞ্চ পাণ্ডবদের এঁকে এঁকে পরীক্ষা নিয়ে তাদের পরাজিত করে। কিন্তু পঞ্চপাণ্ডবেরা তাকে ছাড়তে রাজী নয়, তাঁরা কৌশলে সেই শিক্ষকের কাছে যায় এবং শিক্ষকের কৌশলে পরাভুত হয়ে যুবক তার হাতের আঙ্গুল কাটতে বাধ্য হয়, যুবক পরাজিত হয় এবং এক সময়ে প্রান দেয়। যত সহজে ঘটনা লিখে ফেললাম, নাটকে তত সহজে দেখানো হয় নাই। চমৎকার ভাবে একের পর এক ঘটনা উপস্থাপন করা হয়ে, মানুষ্য চরিত্রের নানান দিক সুকৌশলে দেখানো হয়েছে। শিল্প সাহিত্যের মুল কাজ এটাই, আপনাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে ঘটনা মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়ে দেবে।

ন্যাটকার সফল হয়েছেন। অভিনেতা অভিনেত্রীরা তাদের চরিত্র সফলভাবে উপস্থাপন করেছেন। দর্শকেরা নিঃশব্দতায় এই নাটক উপভোগ করেছেন, যদিও দর্শকের একটা আকাল চোখে পড়েছে! চলুন কিছু ছবি দেখি, আমার ভাঙ্গা মোবাইল ক্যামেরায়, ঝুম করে তোলা ছবি গুলোর কোন বানিজ্যিক মুল্য নেই, তবে ছবি গুলো এটা প্রমান করে, আমি নাটকের একজন খাঁটি দর্শক। বহুদিন পরে এমনই একটা নাটক দেখলাম।


ছবি ১, শিল্পকলা একাডেমি অনেক বড় হয়েছে তবে তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে বলে মনে হয় না, দর্শকের আগ্রহ তৈরীর কাজটা তাদের উপরেও বর্তায়, সেই চেষ্টা তাদের করা উচিত। স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এই সব নাটক দেখার আমন্ত্রণ তারাই জানাতে পারে। মননশীলতা গঠনে তাঁরা এই কাজ তাদের কাঁধে নিতেই পারে, মঞ্চের কাজে দর্শক থাকবে না, এমন ভাবাই যায় না।


ছবি ২, টিকেট।


ছবি ৩, যথা সময়ে দরজা খোলা।


ছবি ৪, মঞ্চ।


ছবি ৫, ঘটনার বর্ননা এমনই শুরু হয়, ছয়জন কথকের মাধ্যমে। এরা এঁকে এঁকে নানান ঘটনার সাক্ষ্য হয়।


ছবি ৬, যুবক এবং পঞ্চ পান্ডব।


ছবি ৭, এদের সবার অভিনয় একটা মাত্রার উপরে উঠেছে, নাটকের সাথে জড়িত বা এখন পত্র পত্রিকায় নাটকের চর্চা কমে যাওয়াতে আমি এদের নাম বলতে পারছি না। এই পঞ্চ পান্ডবের অভিনেতা সিলেকশন আমার কাছে ভাল লেগেছে, বয়স ভেদে এই অভিনেতাদের কর্মকান্ড বা অভিনয় অসাধারণ।


ছবি ৮, যুবকের তীর বিদ্যায় তীরের ভুমিকায় বা দেখানোর বা বোঝানোর উপমা যেশ আনন্দদায়ক।


ছবি ৯, পঞ্চ পান্ডবের দৌপদীর আগমন।


ছবি ১০, বন্যা মির্জার অভিনয় অসাধারণ, একাই সামলেছেন।


ছবি ১১, পঞ্চ পান্ডবের তরুণ এই দুই যুবকে অভিনয়ে নুতন মনে হলেও আগামীতে এরা আরো ভাল করবে। এদের সংলাপ কম হলেও মন্দ করে নাই।


ছবি ১২, দৌপদির সিদান্ত নেয়া।


ছবি ১৩, যুবকের বুদ্ধির কাছে পরাজিত হওয়া।


ছবি ১৪, কথার চাল।


ছবি ১৫, অবশেষে যুবকের প্রেমে পড়া (হা হা হা, এটা বেশ ডাইনামিক আইডিয়া)


ছবি ১৬, অবশেষে ধৌনাচার্য (শিক্ষক, আমি বানান ভুল করেছি মনে হচ্ছে) এলেন এবং বুদ্ধিতে যুবকে পরাজিত করলেন।


ছবি ১৭, দৌনাচার্যের ভুমিকায় নাট্যকার মাসুম রেজাকে আশা করছিলাম, যতদুর জেনেছি তিনিও মাঝে মাঝে এই চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু আজ মনে হল তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তবে এই অভিনেতাও কম নন।


ছবি ১৮, পঞ্চ পান্ডবের এই ছিল মুখ্য পান্ডব, একদম কড়া অভিনেতা। তবে যুবকের অভিনয় সত্যই অতুলনীয়, সাড়া নাটকে তার উপস্থিতি মনে কেড়ে নেয়।


ছবি ১৯, যুবকের মৃত্যু এবং নাটকের পর্দা নামানো, আলো বন্ধ, এই শেষ দৃশ্য দেখার মত ছিল।

মঞ্চ নাটকে আলো, শব্দ, উপস্থাপন ইত্যাদি একদম টাইম টু টাইম হতে হয়। সামান্য ভুলে একটা দৃশ্য মারা পড়তে পারে, শব্দের অপ্রতুলতায় দর্শক বিরক্ত হয়ে পারে, আলোর যথাযত ব্যবহার না হলে একটা চরিত্র সস্তা হয়ে পড়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি মনে করি, এই নাটকে এই সব কোন সমস্যা হয় নাই। বোঝা যায় প্রচুর সময় নিয়ে রিহাশেল করেছে এবং একটা মান সমত মঞ্চ নাটক দর্শকদের সামনে নিয়ে আসতে পেরেছে।


ছবি ২০, নাটক দেখে যথারীতি বাইরে খাবার! হা হা হা, আমি আছি যেখানে, খাবার থাকবে না সে কি করে হয়! তবে এই নাটক দেখা যেমন অনেক দিন পরে হল, তেমনি আমিও ফুটপাতের ( ভাল ভাষায় স্ট্রীট ফুড)  খাবারের স্বাদ অনেকদিন পরে নিলাম। আমাদের ফুটপাতের খাবারের মান বেড়েছে বলে মনে হল।

সবাইকে শুভেচ্ছা। মঞ্চের কাজ দেখুন, যে কোন কিছু লাইভ দেখার আনন্দ আলাদা, আনন্দ নিন।

3 responses to “আড্ডাঃ মঞ্চ নাটক ‘নিত্যপুরাণ’ ও কিছু কথা

[প্রিয় খাদ্যরসিক পাঠক/পাঠিকা, পোষ্ট দেখে যাবার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নিম্মে আপনি আপনার মন্তব্য/বক্তব্য কিংবা পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। আপনার একটি একটি মন্তব্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে কয়েক কোটি বার। আপনার মন্তব্যের জন্য শুভেচ্ছা থাকল। অনলাইনে ফিরলেই আপনার উত্তর দেয়া হবে।]

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s