গ্যালারি

রেসিপিঃ গরুর গোশত রান্না (সরিষার তেলে)


গত কয়েকদিন আগে, বাসে করে উত্তরা যাচ্ছিলাম। বড় বাস, আমার সিট পড়েছিল বাসের পিছনের দিকে। রাস্তায় যানজটে পড়ে আমরা নাকানী চুবানী খেয়ে আমাদের টার্গেটে পৌছার চেষ্টা করছিলাম। পিছনের সারিতে বসা অনেকে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের নিয়ে আলোচনা করে থেমে গিয়েছিল, আমি নিজে শুনে আসছিলাম। হা হা হা। পরে আমার পাশে বসা এক মুরুব্বীর সাথে কথা জমিয়ে তুললাম। উনার বয়স আমার অনুমান ৬০ এর কাছাকাছি হবে। বাজার, ভেজাল, রান্নাবান্না, স্বাদ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার ফাঁকে তিনি জানালেন, এখন কোন মাছ তরকারীতে স্বাদ বা আগের সেই ঘ্রান নেই, আমি সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি নিজেও এখন আর কোন কিছুতেই তেমন ঘ্রান পাই না, অথচ আমি নিজেও দেখেছি ইলিশ মাছ রান্না হলে পাড়া খবর হয়ে যেত, এমন কি একটা ডিম ভাজলেও ঘ্রান বের হত। এই সময়ে তিনি জানালেন, রান্নার ঘ্রান নষ্ট হয়ে যাবার কারন হচ্ছে এখন আর কেহ খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে রান্না করেন না। (আমিও কবে সরিষার তেল দিয়ে কি রান্না করেছি তা মনে করতে পারি না) খাঁটি সরিষার তেলে রান্না হত আগে, ফলে ঘ্রান বের হত। সত্য হবে হয়ত!

এদিকে তিনি আমার সাথে সরিষার তেল নিয়ে আরো গল্প করলেন। তিনি জানালেন, আগে প্রায় গ্রামে ঘানিভাঙ্গানোর ব্যবস্থা ছিল। সরিষার দানা নিয়ে সেই ঘানিতে গেলে তারা তা চিবিয়ে তেল বের করে দিত (এবং এটাকে তেল বলা না হলেও এক ধরনের কালো রস বলা হত), সেই রস বাড়ীতে নিয়ে বড় পাতিলে করে আগুনে জ্বাল দেয়া হত, জ্বালের পর ঠান্ডা করে ছাকুনী বা কাপড় দিয়ে ছেঁকে গাদ ফেলে পরে তেল পাওয়া যেত। এই তেল দিয়েই সারা বছর রান্না হত এবং মানুষ গা গতরে মাখত, বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই সরিষার তেল খুব উপকারী ছিল। খাঁটি সরিষার তেল রান্না করা খাবারে ঘ্রান বের হবেই।

যাই হোক, আমিই উত্তরায় নেমে গিয়ে ভাবছিলাম, বাসায় ফেরত যেয়ে, গরুর গোশত আছে, সরিষার তেল (বাজার থেকে কেনা) আছে, রান্না করবো। তবে সেই দিন আর রান্না করতে পারি নাই। পরের দিন অফিসে বসে ফেসবুক দেখছিলাম, ফেসবুকে আমাদের এক বন্ধু, ‘দিদার কচি‘ ভাই যিনি জাপান থাকেন, উনাকে জাপানে বসে কচি গরুর গোশত রান্না করতে দেখলাম, ছবি গুলো দেখেও লোভ লাগলো। আর যাই কই, বাসায় ফিরেই রান্নায় লেগে গেলাম! সেই ফিডেও সরিষার তেল নিয়ে অনেক আলাপ হল!

চলুন রান্না দেখি। এস ইট ইস! আমাদের সাধারন রান্নাই, শুধু তেল হচ্ছে সরিষার তেল!

উপকরন ও পরিমানঃ
– গরুর গোসতঃ ৭০০ গ্রাম প্রায়, অনুমানিক, হাড় গোড় নেই
– পেঁয়াজ কুঁচিঃ হাফ কাপের কম
– দারুচিনিঃ ২ সেমি, ২/৩ টুকরা
– এলাচিঃ ২/৩ টা
– রসুন বাটাঃ ২ চা চামচ
– আদা বাটাঃ ২ চা চামচ
– লাল মরিচ গুড়াঃ এক চা চামচ (ঝাল বুঝে)
– হলুদ গুড়াঃ এক চা চামচ
– জিরা গুড়াঃ এক চা চামচের কম
– লবনঃ পরিমান মত, দুই ধাপে
– সরিষার তেলঃ হাফ কাপের কম (একটু কমেই রান্না করেছি)
– পানিঃ পরিমান মত, ঝোল থাকবে না তবে গোশত নরম হতে যে পরিমান লাগে
– কাঁচা মরিচঃ কয়েকটা

প্রনালীঃ (ছবি কথা বলে)

ছবি ১, জাপানের মত কি আর কচি গোশত এই দেশে পাওয়া যায়? এখানে পাওয়া সব গোশতই কচি গরুর! শুধু আপনি টের পাবেন, যখন রান্না করবেন তখন!


ছবি ২, যে কোন গোশত ভাল করে ধুয়ে নেয়া দরকার।

মুল রান্নাঃ

ছবি ৩, কড়াইতে সরিষার তেল গরম করুন।


ছবি ৪, এবার লবন ও পেঁয়াজ কুঁচি ভাঁজুন।


ছবি ৫, দারুচিনি, এলাচি দিন।


ছবি ৬, পেঁয়াজ হলদে হয়ে এলে আদা ও রসুন দিন। ভাঁজুন।


ছবি ৭, হাফ কাপ পানি দিয়ে দিন। কষান।


ছবি ৮, এবার মরিচ, হলুদ ও জিরা গুড়া দিন। ভাল করে মিশিয়ে নিন। আগুন মাধ্যম আঁচে থাকবে।


ছবি ৯, তেল উঠে যাবে, কয়েকটা কাঁচা মরিচ দিন।


ছবি ১০, এবার গোশত দিয়ে দিন। ভাল করে মিশিয়ে নিন। আগুন মাধ্যম আঁচে রাখুন।


ছবি ১১, ঢাকনা দিয়ে দিন। আগুন চলুক।


ছবি ১২, মাঝা মাঝে নাড়িয়ে দিতে হবে।


ছবি ১৩, এই অবস্থায় এসে যাবে। (গোশত কচি হলে হয়ে যাবার কথা, কিন্তু আমি দেখলাম গোশত নরম হয় নাই ফলে আরো কিছু গরম পানি দিতে হল, আগুন আরো কমিয়ে সময় নিলাম)


ছবি ১৪, গরম পানি দিয়ে (আপনি নরমাল মাত্রার পানি দিতে পারেন) আবারো কিছু সময় অপেক্ষা করলাম।


ছবি ১৫, এবার খাবারের উপযুক্ত হয়েছে। ফাইন্যাল লবন স্বাদ দেখে নিলাম। ব্যস। ঝোল তেমন রাখার দরকার নেই। ঝোল কমাতে আগুন বাড়িয়ে নাড়াতে হবে, চুলার ধার ছেড়ে যাবেন না!


ছবি ১৬, পরিবেশনা, সাদা ভাত বা পোলাউ নিয়ে বসে পড়ুন। তবে রুটি পরোটা দিয়েও চালানো যেতে পারে।

স্বাদ চরম, সরিষার তেলের ঘ্রানে রান্নায় আলাদা একটা স্বাদ এনে দিয়েছিল।

আশা করি আমাদের সাথেই থাকবেন। যারা নুতন রান্না করছেন, তাদের আমন্ত্রন জানাছি, একবার রান্না করেই দেখুন। রান্না হচ্ছে ভালবাসা, রান্না হচ্ছে মমতা! সবাইকে শুভেচ্ছা।

কৃতজ্ঞতাঃ মানসুরা হোসেন

Advertisements

9 responses to “রেসিপিঃ গরুর গোশত রান্না (সরিষার তেলে)

  1. আমি শুনেছি গরুর গোশত যত কম ধোঁওয়া যায় ততই ভালো। আর মাছের ক্ষেত্রে যত বেশি। কথাটা কত টুকু ঠিক?

    Liked by 1 person

    • ধন্যবাদ সাদেক ভাই,
      এটা ইউরোপিয়ানরা বলে থাকে (অনেক ক্ষেত্রে তারা না ধুয়েও রান্না বা পূড়িয়ে খেয়ে থাকে), তবে আমরা এটা পারি না, মাছ বা গোশত যাই হোক না কেন আমরা ভাল করে ধুয়েই রান্না করি। আমরা হালাল খাবার খাই বলে, আমাদের কাছে পরিষ্কার (মনের মত) করে রান্না করে থাকি। এটাই আমাদের রান্নার ধর্ম। আশা করি বুঝাতে পেরেছি।
      শুভেচ্ছা নিন।

      Liked by 1 person

  2. আজ আমি এই রান্নাটা করেছি, তবে একটু নিজের মত করে বদলে নিয়েছি। একটু আগে খেয়ে উঠলাম। খুব মজা হয়েছে।

    Liked by 1 person

  3. পিংব্যাকঃ সরষের তেলে গরুর মাংসের ঝাল ভুনা | Sort of Everything

  4. দেইখাই এত মজা লটলাম আরত রান্না করলেত মনে হয় আমি ফিট খাইয়া যামু…।

    Liked by 1 person

[প্রিয় খাদ্যরসিক পাঠক/পাঠিকা, পোষ্ট দেখে যাবার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নিম্মে আপনি আপনার মন্তব্য/বক্তব্য কিংবা পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। আপনার একটি একটি মন্তব্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে কয়েক কোটি বার। আপনার মন্তব্যের জন্য শুভেচ্ছা থাকল। অনলাইনে ফিরলেই আপনার উত্তর দেয়া হবে।]

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s