গ্যালারি

বিচিত্র পেশাঃ ৬ (ইসলাম ভাইয়ের বনাজী শরবত)


আমার বড় ছেলেকে স্কুলে দিয়ে এবং নিয়ে আসতে যে পথ দিয়ে যেতে হয়, সেই পথের ধারেই ইসলাম ভাইয়ের বনাজী শরবতের দোকান। দোকান মানে বেশ জকিয়েই বসছেন আমাদের ইসলাম ভাই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী ইসলাম ভাইকে আমি অনেক দিন ধরে দেখে আসলেও কখনো কথা হত না। একদিন সন্ধ্যায় সেই পথ দিয়ে বাসায় হেঁটে আসতে ভাবলাম, ইসলাম ভাইয়ের সাথে আজ কথা বলি!


কিশোর গঞ্জ থেকে ভাগ্যের টানে এই ঢাকা শহরে এসেছিলেন একদিন। মোটামুটি নানান কাজ করেছেন এবং এক সময়ে একটা গ্রোসারী দোকান করতে পেরেছিলেন কিন্তু জীবন সঠিক ভাবনায় চলে না। বাড়ীওয়ালা সেই গ্রোসারীর এডভান্স এবং ভাড়া বাড়াতে ইসলাম ভাই সেটা আর চালু রাখতে পারলেন না। বছর দেড় আগে বাধ্য হয়ে সেই দোকান বন্ধ করে লস দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লেন। এমনি সময়ে মাথায় আইডিয়া এল, খুব কম পুঁজিতে কি করে কিছু একটা করা যায়। খোঁজাখুঁজির এক সময়ে এই শরবতের ব্যাপারটা মাথায় এল। হাতে থাকা টাকা দিয়ে একটা চমৎকার ভ্যান বানিয়ে নিলেন, অনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনে ফেললেন এবং কয়েকদিন ট্রেনিং নিলেন এক পেশাদার শরবত বিক্রেতার কাছে, সাথে কিছু বই পত্র পড়লেন এবং নেমে গেলেন এই মহৎ পেশায়। ইসলাম ভাই জানালেন, গাছ পালার উপরে এই দুনিয়াতে আর কি আছে। মানুষ সহ দুনিয়ার প্রায় সব প্রানীই তো গাছ পালার উপর নির্ভরশীল, গাছ থেকেই তো সব কিছু আসে।

ইসলাম ভাইয়ের এই ব্যবসার মেয়াদ প্রায় দেড় বছর এবং তিনি সাফল্য পেয়েছেন বলেই জানান এবং উপরোয়ালাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন এখন ভাল আছেন। কোন কিছুতেই কোন ভেজাল নেই, নিজ হাতে গাছপালা, ফুল ফল কিনে নিয়ে আসেন এবং ফরমুলা বা কাষ্টমার চাহিদা মাফিক এই বনাজী শরবত বানিয়ে দেন। ফিল্টারের পরিস্কার পানি ব্যবহার করেন। আমি কখনো এমন বনাজী শরবত পান করি নাই শুনে মিষ্টভাষী ইসলাম ভাই বললেন, আপনার জন্য আমি নিজে পছন্দ করে এক গ্লাস শরবত বানিয়ে দিচ্ছি।


কম কথা বলা ইসলাম ভাই বললেন থেমে না যেয়ে এক টানে পান করে ফেলতে। না, আমি পারি নাই। এই গ্লাস শেষ করতে আমাকে তিন টান দিতে হয়েছে এবং শেষেও কিছু বাকী ছিল এবং সেটা হাতে ধরে ইসলাম ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম। তিনি চিরতা চুবিয়ে রাখা একটা বোয়াম দেখিয়ে বললেন, এমন অনেক কাষ্টমার আসে যারা শুধু এলোভেরা এবং চিরতার এই রস মেশানো শরবত একটানে পান করে যায়। আমি আগ্রহ প্রকাশ করে বললাম, চিরতার নাম শুনেছি, অনেক তিতা, একটু দিন দেখি। ইসলাম ভাই কয়েক চামচ চিরতা আমার গ্লাসে মিশিয়ে দিলেন, আমি চেষ্টা করলাম, না সামান্য পান করতে পেরেছি, এই জন্মে এমন তিতা আর পান করি নাই।

আমি প্রায় ঘন্টা খানেক ছিলাম, ইসলাম ভাইয়ের সাথে। দেখছিলাম তার হাতের কৌশল, দারুণ। এত চমৎকার হাতের কাজ, ভালবাসা না থাকলে সম্ভব নয়। এই সময়ে তার অনেক কাষ্টমার দেখলাম, ঢাকা শহরের বাড়ীওয়ালা থেকে দারোয়ান, রিক্সাওয়ালা কে না খাচ্ছে! হা হা হা.।। ইসলাম ভাই বললেন, এই বনাজী শরবতে সত্যই শরীরের অনেক কাজ হয়। শরীরে ছোটখাট রোগ প্রবেশ করতে পারে না, ক্যালসিয়াম থেকে শুরু করে নানান খনিজ শরীরে কাজ করে। (যাই হোক, তিনি ভেজাল দিচ্ছেন না এবং কাষ্টমারের সামনেই যা বানিয়ে দিচ্ছেন, এটাও কম কিসে)

আমি ভাবছি, আরো অনেক দিন ইসলাম ভাইয়ের বনাজী শরবত পান করবো এবং তার নানান পদের শরবতের স্বাদ নিবো।

পেশা হিসাবে আমি এটাকেও বিচিত্র মনে করি এই জন্য যে, এটা সবার দারা সম্ভব নয় এবং এই পেশায় যে জ্ঞান থাকতে হয় সেটা অনেকেই অর্জন করতে পারবেন না। পাশাপাশি এটা একটা সৎ পেশা, খুব ভোরে উঠে নানান জায়গা থেকে নানান ভেজষ কিনে নিয়ে সেটা পরিস্কার পরিছন্ন করে ধুয়ে, সাজিয়ে বসা এবং নানান পদের ভেজষ কয়েকদিন বা কয়েক ঘন্টা পানিয়ে চুবিয়ে তার রস বের করা এবং তার গুনাগুন থাকা বস্থায় বিক্রি করা সহজ কাজ নয়।

আমি ইসলাম ভাইয়ের এই বনাজী শরবতের ব্যবসার সাফল্য কামনা করি। উপরোয়ালা উনাকে হাসি খুশি রাখুন।

বিদ্রঃ সাধারনত ১০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত এক গ্লাস শরবত বিক্রি হয়, কাষ্টমার ইচ্ছা হলে কাষ্টমাইজ করতে পারেন। চিনি ছাড়া না চিনি দিয়ে, এটা না ওটা, যেভাবেই কাষ্টমার চাইবেন!

বিচিত্র এই দেশ, বিচিত্র এই দেশের মানুষ, কত কি বিচিত্র পেশা! তবে সবই জীবিকার টানে!

(আসছি, আরো নানান বিচিত্র পেশা নিয়ে, আশা করি সাথে থাকবেন।)

বিচিত্র পেশাঃ ৫ (নুরু মিয়ার নেহারী রান্না)
http://www.somewhereinblog.net/blog/udraji/30001660

Advertisements

4 responses to “বিচিত্র পেশাঃ ৬ (ইসলাম ভাইয়ের বনাজী শরবত)

  1. মুলত এই সিরিজ সামুতে প্রকাশিত। খাবার দাবার বিষয় হলে এখানে এনে একটা কপি রাখছি। আশা করি রেসিপি প্রিয় বন্ধুরা মনে কিছু নিবেন না। রেসিপি আসছেই!

    Liked by 1 person

  2. Amio rastay emon dokan dekhechi onekbar. Onader ta ekbar try korar echa ache. Basay ami only Aloe vera juice baniye kheyechi. Not bad at all. Thanks for sharing, Vaiya

    Liked by 1 person

  3. উদরাজী ভাই, আপনার এই “বিচিত্র পেশা” সিরিজটা কিন্তু চমৎকার হচ্ছে।

    আর একটা প্রস্তাব দেই, আপনি চাইলে, এই সিরিজে জায়গাগুলির পুরো ঠিকানাও দিয়ে দিতে পারেন, তাতে করে আপনর এই লেখা দেখে কিছু আগ্রহী ব্যাক্তি হয়ত ওখানে যেতে চাইবেন, তাদের সুবিধা হবে।

    Liked by 1 person

[প্রিয় খাদ্যরসিক পাঠক/পাঠিকা, পোষ্ট দেখে যাবার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নিম্মে আপনি আপনার মন্তব্য/বক্তব্য কিংবা পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। আপনার একটি একটি মন্তব্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে কয়েক কোটি বার। আপনার মন্তব্যের জন্য শুভেচ্ছা থাকল। অনলাইনে ফিরলেই আপনার উত্তর দেয়া হবে।]

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s