Gallery

রেসিপিঃ চিকেন উইং ফ্রাই (কোরিয়ান স্টাইল এক্সপেরিমেন্ট) এবং সাইটে ৮ লক্ষ হিটে আপনাদের জন্য শুভেচ্ছা ও ভালবাসা


কোরিয়াতে আমার বড় ভাই এক টানা অনেক বছর কাজ করেছেন, শেষে যা হবার তাই হল। দেশে ফিরে এলেন। অথচ আরো কিছু বছর থেকে এলে হয়ত পরিবারের জন্য ভাল হত! আমার অবস্থাও তাই, মধ্যপ্রাচ্যে সাড়ে নয় বছর প্রবাসে থেকে হাঁপিয়ে উঠে সব কিছু লাথি মেরে চলে এলাম, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, দেশে ভিক্ষা করে খাব তবু আর বিদেশ নয়! এর পরের ইতিহাস ভিন্ন, জীবনের প্রায় সব কিছুতেই আমাদের পরিবারের মানুষ গুলো ভুল করতে লাগলো, আমিও! জীবনে একবার ভুল করলে আর উঠে আসা যায় না, সেটা বুঝতেও আমার দুই ছেলের বাবা হতে হল! হা হা হা, সে যাই হোক, দুঃখের কথা নাই বা বলি! আজ ভাইদের গল্প বলি (এক বোনের গল্প তোলা থাক)! আমরা তিনভাই বলতে গেলে একই খাটে শুয়ে বসে বড় হয়েছি। আমাদের তিন ভাইয়ের আড্ডা সহ নানান কারবার, এখনো আমার চোখে ভাসে!

বড় ভাই তখন কোরিয়া থেকে ফিরে এসেছেন, দীর্ঘ দিন কোরিয়ায় থাকা এবং চ্যাপেষ্টিক দিয়ে খাবার খেয়ে হাত দিয়ে ভাত খেতে পারেন না (অবশ্য এখনো হাত দিয়ে খাবার খেতে পারেন না, অন্তত একটা টেবিল চামচ হলেও লাগে)। এমতাবস্থায় উনার দেশী আমাদের খাবারও মুখে লাগত না। কোরিয়ার নানান খাবার দাবার নিয়ে উনার সাথে প্রায় কথা হত এবং তিনি আমাদের কোরিয়ার বিখ্যাত খাবার কিমছি (আমার ভুল হতে পারে) ও চিকেন ফ্রাই এর কথা শুনাতেন। এর পর একদিন তিনি বাসায় নিজ হাতে কিমছি রান্না (মুলার শাক দিয়ে) করেছিলেন এবং সেটা শুধু আমি আর তিনি খেয়েছিলাম, পরিবারের অন্যরা ঘ্রান নিয়েও দেখে নাই (উপরন্তু উলটা পালটা কথা শুনিয়েছিল)। এর পরের ঘটনা যা হবার তাই হল, তিনি আমাদের আগ্রহ দেখে কোরিয়ান খাবারের আর কোন কিছু রান্না করতে আগ্রহী হলেন না! তবে এখনো আমরা দুইভাই একত্রিত হলে কোরিয়ান খাবারের গল্প করি।

বাংলাদেশে কোরিয়ান খাবার দাবারের কয়েকটা রেষ্টুরেন্ট হয়ে গেছে, গুলশান বনানীতে। আমি এখনো কোন কোরিয়ান রেষ্টুরেন্টে খাই নাই তবে সামনে ইচ্ছা আছে, সুযোগ পেলে খেয়ে দেখবো। কোরিয়ানদের নিয়ে আমাদের দেশে একটা চ্রম বদনামী আছে যে, কোরিয়ানরা কুকুরের মাংস খায়! ঢাকা চট্রগ্রাম হাইওয়ে করতে কোরিয়ানরা একবার কন্টাক পেয়েছিল এবং সেই সময়েই তারা এই সুনাম কামিয়েছিল! হা হা হা, আশে পাশের সব গ্রামের বেওয়ারিশ কুকুর খেয়ে ওরা সাফ করে দিয়েছিল। যাই হোক, এক দেশের বুলি, অন্য দেশের গালি!

যাই হোক, আমাদের এই সাধারণ রেসিপি সাইট ‘গল্প ও রান্না’র ৮ লক্ষ হিট উপলক্ষে আপনাদের কোরিয়ান স্টাইলে চিকেন উইং ফ্রাই দেখাবো বলে সিদান্ত নিয়েছি। এই চিকেন উইং ফ্রাই রান্নাটা আমার কাছে একটা এক্সপেরিমেন্ট বটেই! কারন এই রান্নাটা আমি অনেকদিন আগে এক টিভি প্রোগ্রামে দেখেছিলাম এবং সেটা মনে গেঁথে গিয়েছিল। সামান্য কিছুটা এদিক সেদিন হলেও মুল রান্নাটা এমনি ছিল বলে এখনো মনে পড়ছে! চলুন রান্না দেখে ফেলি।

উপকরণঃ
মুল উপকরনঃ
– চিকেন উইং, দশ/বারটা (বাজারে আলাদা কিনতে পাওয়া যায়, নতুবা বাসায় জমিয়েও রাখা যায়)

মশলা পাতিঃ
প্রথম বাটিতেঃ (একটু দেশী বানিয়ে নিতে)
– পেঁয়াজ বাটা, ২ টেবিল চামচ
– আদা বাটা, ১ টেবিল চামচ
– রসুন বাটা, ১ চা চামচ
– গোল মরিচ গুড়া, হাফ চা চামচ

২য় বাটিতেঃ
– সয়াসস, এক কর্ক
– ওয়েষ্টার সস, এক টেবিল চামচ
– টেমটো সস, ৪ টেবিল চামচ
– চিনি, এক চিমটি
– এবং পানি, হাফ কাপ

৩য় বাটিতেঃ
– তেলে ভাঁজা চীনা বাদাম, কয়েক চামচ (আমি একটু বেশী দিয়েছিলাম, যা কম দিলে আরো দেখতে ভাল লাগত)

বিবিধঃ
– তেল (হাফ কাপ বা কম, দুই দফায়)
– লবন (পরিমান মত, সসে লবন থাকে বলে বুঝে শুনে লবন দিতে হবে)

প্রনালীঃ
চিকেন প্রিপারেশনঃ

ছবি ১, চিকেন উইং গুলো ভাল করে পরিস্কার করে ধুয়ে সামান্য লবন এবং সামান্য মরিচ গুড়া দিয়ে মেখে নিন।


ছবি ২, এভাবে ফ্রীজের নরমাল প্রকোষ্টে মিনিট ৩০ রেখে দিন, ম্যারিনেটেড।


ছবি ৩, কড়াইতে তেল গরম করে চিকেন উইং গুলো ভেঁজে নিন। (ডুবো তেলে ভাঁজতে পারলে ভাল হত, কিন্তু আমি তেল নষ্ট করতে রাজী নই। বেশী লোকের জন্য রান্না করলে অবশ্যই ডুবো তেলে ভাঁজা যেতে পারে।)


ছবি ৪, এক পিট হয়ে গেলে অন্য পিট উল্টে দিন। যে কোন কিছু ভাঁজাতে সাবধানে। তেলের ছিটে গায়ে যে না পড়ে।


ছবি ৫, এভাবে ভেঁজে চিকেন উইং গুলো তুলে রাখুন।

মুল রান্নাঃ

ছবি ৬, অন্য একটা কড়াইতে ৫/৬ টেবিল চামচ তেল গরম করে তাতে প্রথম বাটির ভেজষ পেঁয়াজ, রসুন, আদা, গোল মরিচ দিয়ে ভাল করে ভেঁজে নিতে হবে।


ছবি ৭, এবার তেলে ভেঁজে তুলে রাখা চিকেন উইং গুলো দিয়ে দিন।


ছবি ৮, ভাল করে মিশিয়ে নিন, আগুন মাধ্যম আঁচে থাকবে।


ছবি ৯, এবার সস মিক্স দিয়ে দিন।


ছবি ১০, ভাল করে নাড়িয়ে, আগুন মাধ্যম রেখে চলুক।


ছবি ১১, মিনিট কয়েক পর বাদাম দিয়ে দিন।


ছবি ১২, আগুন কম থাকবে। ভাল করে আবারও মিশিয়ে নিন এবং ঢাকনা দিয়ে কয়েক মিনিট রাখুন। চুলার ধার ছেড়ে যাবেন না।


ছবি ১৩, ফাইন্যাল স্বাদ দেখুন। লবন লাগলে ছিটিয়ে দিইয়ে আবারও মিশিয়ে নিন। তেল উঠে গেলেই ব্যস!


ছবি ১৪, পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত।


ছবি ১৫, পোলাউ বা রুটি বা পরোটার সাতে দারুন জম্বে! আমার রান্না টেষ্টার বুলেট খুব পছন্দ করেছে এবং আপনাদের ব্যাটারী ভাবী, বাদাম দেয়াতে খুব একটা খুশি হতে পারেন নাই! তবে আমি জানি কোরিয়ানরা এভাবে বাদাম খেতে খুব পছন্দ করে!

যাই হোক, আশা করছি, এই সহজ রান্নাটা একদিন ঘরে করে দেখতে পারেন। বিশেষ করে কোন বিশেষ দিনে। রোষ্ট, পোলাউ, রেজালা টাইপ খাবার দাবারতো চালিয়েই যাচ্ছেন, মাঝে মাঝে একটু ভিন্ন স্বাদের হলে মন্দ কি!

এবার গল্পের শেষ কথা, কোরিয়ানরা কুকুর খেতে খুব পছন্দ করে এর সত্যতা জানার জন্য একদিন বড় ভাইকে বিষয়টা জানালাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ ওরা কুকুর কেন দুনিয়ার এমন কিছু নাই যে, খায় না! তবে কোরিয়ান উচ্চবিত্তরা এইসব কুকুর, সাপ, বিচ্ছু খায় না!

সবাইকে শুভেচ্ছা, আপনাদের ভালবাসায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, ৮ লক্ষ হিট করে আপনারা প্রমান করছেন, আপনারা আমাদের সাথে আছেন। আমরা আমাদের দেশের আরো আরো সহজ খাবারের রেসিপি নিয়ে আসছি। আশা করি সাথেই থাকবেন।

6 responses to “রেসিপিঃ চিকেন উইং ফ্রাই (কোরিয়ান স্টাইল এক্সপেরিমেন্ট) এবং সাইটে ৮ লক্ষ হিটে আপনাদের জন্য শুভেচ্ছা ও ভালবাসা

  1. বাদাম আমারও একদম অপছন্দ…

    Liked by 1 person

  2. Badam chara amio ranna kore deakbo.

    Liked by 1 person

  3. সালাম উদরাজী ভাই, আছেন কেমন? আপনার এই পোস্টে ২ টা বিশাল কমেন্ট করব, রেডি থাকেন 🙂

    আপনার ভাইয়ের কোরিয়ান খাবার খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা পড়লাম, আমারো কিছুটা একই অভিজ্ঞতা। বিদেশী খাবার খাওয়াতে গিয়ে অনেকেই মুখে মুখে খুব ভালো বলেছেন, তবে হয়ত তাদের তেমন ভালো লাগে নাই 🙂 তবে এরপর ভেবে দেখেছি, তাদের তেমন দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমি যখন নিজে বাইরে আসি, প্রথম প্রথম এদের খাবারগুলি জঘন্য লাগতো, তবে আস্তে আস্তে স্বাদ বুঝতে শিখেছি, অনেক কিছুই এখন ভালো লাগে যেটা আগে ভালো লাগতো না। অভ্যস্ততা একটা খুব ইমপর্ট্যান্ট ব্যাপার। ৭ বছর ধরে দেশের বাইরে, এমন অনেক জিনিস খাই, ধরেন এনচোভি অথবা সুশি, যেটা দেশে গিয়ে কাউকে খাওয়ালে বমি করে দিবে, তারপর রান্নাঘর গিয়ে দাও নিয়ে আমাকে তাড়া দিবে 🙂 ।

    তাই মাঝে মাঝে ভাবি, কেউ যদি বিদেশী খাবার নিয়ে জানতে চায়, তাহলে তাকে আস্তে আস্তে একটু একটু করে পরিচয় করানোই ভালো, ধরেন কোনো বিদেশী লোক যদি বাংলাদেশী খাবার নিয়ে আগ্রহ দেখায়, তাকে প্রথদিনই হয়তো আমি শুটকি খাওয়াবো না, বরং জাস্ট পাঁচফোড়ন দিয়ে হালকা সব্জী ভাজি খাওয়াবো। আর বিশেষ করে যাকে খাওয়াচ্ছি, তার যদি অন্যদেশী খাওয়ার অভিজ্ঞতা কম থাকে, তাহলে তো আরো সবধানতা দরকার।

    এটা নিয়ে আমার একটা মজার কাহিনী শেয়ার না করে পারছিনা। ৩/৪ বছর আগে আমার ছোট দাদা-দাদী আমেরিকায় আমাদেরকে দেখতে এসেছিলেন, তাঁরা থাকেন লন্ডনে। সেই দাদী অনেক শখ করে আমাদের জন্য সুটকেস ভর্তি করে বিভিন্ন খাবার আর মশলাপাতি নিয়ে এসেছিলেন। তিনি একদিন খুব শখ করে একটা চাইনিজ রান্না করে খাওয়ান মাংস দিয়ে, যেটা খেয়ে আমাদের কারোরই খুব ভালো লাগেনি, ওনার সামনেই আমি নাক শিঁটকেছিলাম, আমার মনে আছে। বছর দুয়েক পরে, আমি একটা চাইনিজ দোকানে আসল ঝাল সিচুয়ান খাবার খেয়ে সিচুয়ানের খুব ভক্ত হয়ে পড়ি, আর সেই রান্না বাসায় করার সিদ্ধান্ত নেই। নেট ঘেঁটে রেসিপি খুঁজে দেখলাম, সেই রান্নায় “তোবান জান” বলে একটা মশলা লাগে, আনি আমার শহরের সব চাইনিজ দোকান ঘুরে সেই মশলা পাইনা, কারণ চাইনিজ পড়তে পারিনা। সে রাতে ফ্রিজ পরিষ্কার করতে গিয়ে হঠাৎ দেখলাম, কোণার দিকে একটা হাফ-খালি কাচের ছোট জার পড়ে আছে, সেটার গায়ে ইংরেজীতে লেখা “তোবান জান”!! দাদীর সেই মাংস রান্নার মশলা, যেটা খেয়ে নাক কুচকেছিলাম একদিন, সেটা আসলে ছিলো সিচুয়ান। আজ আমি আর আমার বৌ দুজনই সিচুয়ান খাবার পেলে হামলে পড়ে খাই।

    Liked by 1 person

[প্রিয় খাদ্যরসিক পাঠক/পাঠিকা, পোষ্ট দেখে যাবার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নিম্মে আপনি আপনার মন্তব্য/বক্তব্য কিংবা পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। আপনার একটি একটি মন্তব্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে কয়েক কোটি বার। আপনার মন্তব্যের জন্য শুভেচ্ছা থাকল। অনলাইনে ফিরলেই আপনার উত্তর দেয়া হবে।]

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s