Gallery

উপহারঃ কার না ভাল লাগে?


আমি এখন যে অফিসে কাজ করি, তার অনেক কাজের মধ্যে একটা প্রধান কাজ হচ্ছে মোবাইল ফোন ধরা (এই সিমটার বয়স প্রায় ১৪ বছর এবং এই ব্যবসাতেই লেগে আছে) মানে অফিসের বড় কর্তার (তিনি বছরে অনেক সময় দেশের বাইরে থাকেন) মোবাইল ফোনটা আমার কাছেই থাকে এবং সেই হিসাবে আমি সারাদিন নানান অপরিচিত মানুষের ফোন ধরি এবং কথা বলি। বলা বাহুল্য যে, আমাদের ব্যবসার একটা প্রধান অস্ত্র হচ্ছে এই মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোনে লোকে আমাদের কাছে দেশ বিদেশ থেকে ইনফরমাশন জানতে চায় এবং আমরা তা সরবরাহ করি, এবার মন চাইলে ওরা আমাদের কাছে আসে! আমাদের কিছু লাভ হয়, তাতে আমাদের সংসার চলে! মানুষের ফোনে সঠিক ইনফরমেশন না দিতে পারলে বা বেশি কম বললে, এই মানুষ গুলো আর আমাদের কাছে আসে না, ফলে আমাদের যা হবার তাই হয়!

যাক যা বলছিলাম, এই ফোন ধরার মাঝে আমার নিজের ফোনটা (নিজস্ব সিম) আজকাল খুব কম বেজে উঠে! আমার ফোনে নাম্বার বিহীন কল আসে না, যারা কল দেয় প্রায় সবাই পরিচিত, ফোন করলেই তাদের নাম ভেসে উঠে তবে এই দোলাচলে সপ্তাহে কয়েকটা কল আসে যাতে নাম্বার উঠে শুধু, নাম উঠে না! আমি বুঝতে পারি, এই কল গুলো নেট থেকে আমার নাম্বার নিয়ে কল দেয়া কোন রেসিপি প্রিয় ভাই বা বোন। এই কল গুলো ধরতে আমি খুব উৎসাহ বোধ করি। গত কয়েকদিনে এই রকম চারটে কল আসে, মোহামদপুর থেকে এক বোন, জার্মানী থেকে এক ভাই, গাইবান্ধা থেকে এক ভাই (উনার ব্যাপারে আর একদিন লিখবো, আমার গল্প ও রান্নার একজন মোবাইল পাঠক এবং আমি উনার কথা শুনে অবাক হয়েছি) এবং রাজধানীর উত্তরা থেকে এক ভাই!

উত্তরা থেকে ফোন করেছিলেন সবুজ ভাই। খাদ্যরসিক সবুজ ভাইয়ের সাথে পরিচয় ফেবু থেকে, তিনি অন্য একটা নিক নেম নিয়ে ফেবুতে আছেন। সবুজ ভাই জানালেন, তিনি পুরানো বই ঘাঁটতে গিয়ে একটা বই পেয়েছেন এবং সেই বইটা তিনি আমাকে উপহার পাঠতে চান। ফোনে তিনি বইটার লেখকের নাম জানালেন এবং আমাকে তার কিছু কথা বললেন। সত্য কথা বলতে কি, আমি এই বই লেখকের নাম আগে শুনি নাই (আমার বর্থ্যতা, কত অজানা আছে এই দুনিয়ায়) এবং অনলাইনে থাকাবস্থায় আমি খুঁজে দেখলাম, লেখক একজন ব্রেড মেকার! হা হা হা, মানে লেখক রান্নার সাথে জড়িত! নেটে আরো কিছুক্ষন ঘেঁটে দেখলাম, এই যে এলাহি কারবার! ভদ্রলোক প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পার হতে পারেন নাই আর রুটি বানিয়ে অষ্ট্রেলিয়ার বিলিয়নারদের একজন!  বলে কি!

যাই হোক, সবুজ ভাইকে অফিস এড্রেস মেসেজ করে, আরো কিছুক্ষন নানান লিঙ্ক ঘুরে উক্ত লেখকের কর্ম কান্ড দেখলাম! তিনি শুধু অস্ট্রেলীয় শীর্ষ একজন ধনী ব্যক্তি নন এখন একজন শিক্ষক বটে, দুনিয়ার নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়ে মানুষকে এখন অনুপ্রাণিত করেন। কতই না আজব ঘটনা! অথচ এক সময় তিনি ছিলেন অর্থহীন মানুষ যার প্রথম স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল!


ঠিক দুই দিন পরে সবুজ ভাইয়ের উপহারটা আমার অফিসে এসে পৌঁছে।


বইটা হাতে পেয়ে সবুজ ভাইকে মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দেই, তিনি মেসেজের উত্তর দেন ‘থ্যাঙ্কস গড’! মানে বই পেয়ছি আমি আর সবুজ ভাই উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ জানালেন! হা হা হা। বইটা খুলে তা বাংলায় দেখে মনটা আরো বড় হয়ে গিয়েছিল! হা হা হা, আসলে আজকাল আর ইংরেজী পড়ে দেখতেও ইচ্ছা হয় না! বিশেষ করে নেটের দুনিয়ার অভ্র এসে এবং আমাকে বাংলা টাইপ শিখিয়ে আর অন্য ভাষার সব আগ্রহ কেড়ে নিয়েছে! যাই হোক, বইয়ের লেখক এই রন্ধনশিল্পীর নাম ‘টম ও’টুল’ (Tom O’Toole) এবং তিনি বেশ কয়েকটা বই লিখেছেন এবং এই বইটার নাম ‘ব্রেড উইনার’। ব্রেড উইনার নামেই বুঝা যায় তিনি কি উইন করেছেন! দুনিয়াতে খাদ্যে সফল হওয়া সহজ কাজ নয়, খাদ্যে মানুষের ভালবাসা পাওয়া কঠিন কাজের একটা।


বইটা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন অনুবাদক নিজাম উদ্দিন লস্কর।


বইয়ের শেষ পাতায় অনুবাদক নিজাম উদ্দিন লস্কর সাহেবের পরিচয় দেয়া আছে, সেটা পড়েও আমি আনন্দিত। দুনিয়ার কত মানুষ কত কি করছেন, আর আমার কথা চিন্তা করলে মনে হয় সারা জীবন বসেই কাটিয়ে দিলাম, কিছুই করা হল না! সামান্য নেটে রেসিপি লিখা, সেটাও আর পারলাম কই!


অনুবাদকের পরিচিতিটা আপনাদের পড়ে দেখার অনুরোধ করে গেলাম। বইটার তো আর সব পাতার ছবি দিতে পারবো না।


লেখক পরিচিতি! অবশ্য আপনারা নেট থেকে এর চেয়ে আরো ভাল পরিচয় পেতে পারেন। Tom O’Toole, baker extraordinaire, kindergarten failure-turned-author & inspirational speaker, and founder of the famous Beechworth Bakery.


বইটার প্রফেসে এই কথাটাও লক্ষ কথার একটা কথা।  “যে স্বপ্ন দেখে না, মানুষকে স্বপ্ন দেখায় না, সে কখনো বিপ্লবী হতে পারে না” মার্কা কথা! আসলে গুণীজনদের কথা মেনে চললেই সফলতা আসে জীবনে, আমরা মানি না বলেই গরীবি জীবন কাটাই!


সূচিপত্র। আমি বই পড়তে গেলে সূচিটা আগে পাঠ করে নেই। এটা আমার প্রচীন অভ্যাস! হা হা হা, তবে কখনো সূচি দেখে কোন বই মাঝ থেকে পড়ি না, পড়া শুরু করি প্রথম থেকেই!


বইটা অফিসেই পড়া শুরু করেছিলাম অনেকটা সব কাজ ফেলেই! কয়েক ঘন্টায় অর্ধেকের বেশী পড়ে ফেলেছিলাম।


বই পড়ার সময় মনিটরে গল্প ও রান্নার ট্যাব খুলে ছিল! গল্প ও রান্নার পাশাপাশি ফেবুতে টম ও’টুল নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, আরামের চৌহাদ্দি ছেড়ে বেরিয়ে আসুন, মানুষ আপনার কথা বলবেই”! – টম ও’টুল


বইটার এই অধ্যায়ে এসে ভীষণ আটকে পড়ছিলাম। লেখকের প্রথম স্ত্রী কি করে দুই সন্তান রেখে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল এবং সেই অবস্থা থেকে তিনি কি করে উৎরে এলেন, বিষদ বর্ননা! লেখকের এই স্ত্রীর নেশা ছিল টাকা, ক্লাব, আড্ডা, পান ইত্যাদি। মোদ্দা কথা লেখক স্ত্রীর এই সব খায়েস মিটাতে পারেন নাই বলেই স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল (ট্রিপিক্যাল বাংলা ঘটনা)। কিন্তু পরে তিনি সফল ব্যক্তি হওয়ায় এই স্ত্রী তার কাছে ফিরে আসতে চাইছিলো এবং পরে আর তা হয় নাই! আসলে লেখকের প্রথম স্ত্রী বুঝতে পারে নাই কি রত্ন সে হারিয়েছিল! দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ হারিয়েই বুঝতে পারে! হা হা হা। যাই হোক, এই সফল ব্যক্তি (অর্থে ও যশে) পরে আবার বিবাহ করেন এবং এই স্ত্রী তার বর্তমান ব্যবসার একজন অংশিদার এবং উনার ব্যবসার প্রধান প্রশাসক হিসাবে কাজ করেন। এই স্ত্রীকে পেয়েই তিনি জীবনে আরো সাফল্য লাভ করেন। লেখক স্বীকার করেন ২য় স্ত্রী তার সাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে কাজ করেছেন বলেই আরো আরো সাফল্য এসেছে!


এই লেখক নিজেই তার বইতে বলেছেন, ওই সেই একই কথাই, “যে স্বপ্ন দেখে না, যে মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না, সে কখনো বিপ্লবী হতে পারে না”!

(অফিসে ২য় দিনে বইটা পড়ে শেষ করেছিলাম)

বই পড়ার মজাই আলাদা। ধন্যবাদ সবুজ ভাই, বইটা না পাঠালে আমি একটা সুন্দর মানুষ প্রসঙ্গে জানতে পারতাম না। আপনি সত্যি ধরেছেন, বইটা আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছে। দুনিয়াতে আমরা কত মানুষ কতভাবে বেঁচে আছি এবং খ্যাত হয়ে যাচ্ছি। তবে এই সফল ব্যাক্তি টুম ও’টুল তার বইতে স্বীকার করেছেন, শুধু টাকা দিয়েই সুখি হওয়া যায় না, সুখের সংজ্ঞা ভিন্ন! সুখের সাথে টাকার কোন সম্পর্ক নেই!

আমি আসলে টাকা ছাড়া ভালবাসা খুঁজি ফিরি! সবাইকে শুভেচ্ছা। ধন্যবাদ প্রিয় রেসিপি পাঠক/পাঠিকা ভাই/বোন বন্ধুরা। বইটা পেলে পড়ে নিতে ভুলবেন না, ভাল থাকুন সবাই।

5 responses to “উপহারঃ কার না ভাল লাগে?

  1. শুধু টাকা দিয়েই সুখি হওয়া যায় না, সুখের সংজ্ঞা ভিন্ন! সুখের সাথে টাকার কোন সম্পর্ক নেই!
    এই সহজ সরল কথা আমরা কেউই বুঝতেও চাইনা মানতেও চাইনা।

    আপনার উপহার প্রাপ্তিতে অনেক খুশি হলাম সাহাদাত ভাই। আপনার পোষ্ট করা দারুণ সব রেসিপি সত্যিই চমৎকার।
    ভালো থাকবেন সবসময়।

    Like

[প্রিয় খাদ্যরসিক পাঠক/পাঠিকা, পোষ্ট দেখে যাবার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নিম্মে আপনি আপনার মন্তব্য/বক্তব্য কিংবা পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। আপনার একটি একটি মন্তব্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে কয়েক কোটি বার। আপনার মন্তব্যের জন্য শুভেচ্ছা থাকল। অনলাইনে ফিরলেই আপনার উত্তর দেয়া হবে।]

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s