Gallery

রেসিপিঃ জিলাপী (আবুল বাসার ভাই স্পেশাল ও ৫০০তম পোষ্ট)


জিলাপী, কে না পছন্দ করেন! মিষ্টি জাতীয় খাবারের কথা মনে আসলেই প্রথমেই জিলাপীর কথা মনে পড়ে। বাংলাদেশের প্রায় মানুষই জিলাপীর স্বাদ নিয়েছেন বলে আমি মনে করি। জিলাপী সাধারণত পথের ধারের সাধারন দোকানেই পাওয়া যায়। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটের প্রতি কিলো মিটারে দুই চারটা জিলাপীর দোকান পেয়ে যাবেনই। বিশেষ করে যেখানে মানুষের জটলা একটু বেশি তার পাশে কেহ না কেহ জিলাপী বানিয়ে বিক্রী করেনই। বিশেষ করে চার রাস্তার মোড়ে তো কয়েকটা জিলাপীর দোকান চোখে পড়বেই। মোট কথা, সস্তায় অনেক মানুষকে মিষ্টি মুখ করাতে জিলাপীর কদর অনেক।

এখন কথা হচ্ছে জিলাপী বানানো কি কঠিন কাজ! না, তেমন কঠিন কাজ নয়। তা হলে ঘরে ঘরে কেন জিলাপী বানানো হয় না? এর জবাব দুটো হতে পারে, প্রচুর তেল, চিনি এবং অন্যটা হচ্ছে এরেঞ্জমেন্ট। অন্য আর একটা হতে পারে, হাতের কাছেই জিলাপী দোকানে পাওয়া যায় বলেই ঘরে এই চেষ্টা করা হয় না!

আজ আপনাদের আমাদের মহল্লার আবুল বাসার ভাইয়ের জিলাপীর রেসিপি দেখিয়ে দেব। তিনি নিজেই দোকানের মালিক এবং নিজেই জিলাপী বানান। সাথে একজন সহকারী কারিগর থাকে কিন্তু বেশীর ভাগ সময়েই একা একাই এই কাজ করে থাকেন। আবুল বাসার ভাইয়ের জিলাপীর কদর কেমন তা উনার দোকানে কিছুক্ষন দাঁড়ালেই বুঝা যায়। গরম গরম জিলাপী তুলে রাখলেই নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। সকাল সন্ধ্যা কিংবা হাল্কা শীত পড়লে বেশী জিলাপী বিক্রি হয় বলে জানালেন। আমি মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চললেও মাঝে মাঝে আবুল বাসার ভাইয়ের দোকান থেকে দুইএকটা জিলাপী খেয়ে থাকি। পরিচয়ের সুত্র ধরে আমি মাঝে মাঝে আবুল বাসার ভাইয়ের সাথে কথা বলি। কাজের ফাকে জবাব দিতে ভুল করেন না। সব সময় হেসে কথা বলেন, আমি কখনো বিরক্ত হতে দেখি নাই। গতকাল জিলাপীর রেসিপি নিয়ে কথা হল, তিনি আমাকে হাতে নাতে সব ধরিয়ে দিলেন। আমি শিখে নিলাম এবং বললাম, আপনার এই রেসিপি আমি সারা দুনিয়ার মানুষকে জানিয়ে দেব। হেসে জানালেন, জানান, এটা আরো ভাল হবে।  চলুন দেখে ফেলি।

প্রয়োজনীয় পরিমান ও উপকরনঃ (এটা ঘরে বানানোর রেশীয়)
– এক কেজি সাদা আটা (কিছুতেই ময়দা নয়)
– ১০০ গ্রাম বেশন (বেশি দেয়া চলবে না)
– পানি (তরল বানাতে যা লাগে, চিনির সিরাতেও পানি লাগে)
– তেল (আপনি যে কাড়াইতে ভাঁজবেন সেই পরিমান, ডুবো তেলে ভাজতে হয়)
– চিনির সিরা (পরিমান নিজেই নির্ধারন করে নিন, সিরা গাঢ় হতে হবে)

প্রনালীঃ

উপরের পরিমান মত আটা এবং বেশন ভাল করে মিশিয়ে নিন। এবার পানি দিতে থাকুন এবং মিশাতে থাকুন। এই তরলটা এমন হবে যে, না শক্ত না বেশি তরল। যত ভাল করে মিশিয়ে এই তরল বানাবেন জিলাপী ততই জিলাপী মশৃন ও ভাল হবে। বড় চামচ দিয়ে তরল তুলে উপর থেকে নিচে ছাড়ুন, পরার গতিটা খুব কম নয় আবার বেশীও হবে না। (যদি কম বেশি হয় তবে পানি বা আটা দিয়ে ঠিক করে নেবেন)

চিনির সিরাঃ এদিকে এভাবে কাই বানিয়ে রেখে অন্য একটা বড় হাড়িতে চিনির সিরা বানাতে হবে। পানিতে চিনি দিয়ে ভাল করে গুলে (মিশিয়ে) চুলায় গরম করতে হবে এবং বার বার নাড়িয়ে চিনির সিরা গাঢ় করে নিতে হবে। এই তরল সিরাও না বেশি গাঢ় না বেশী তরল হবে। সিরা হয়ে গেলে পাশে রেখে ঠান্ডা করে নিন। জিলাপী ভেজে পরে এই ঠান্ডা সিরায় রাখা হবে।


কাই বা তরল হয়ে গেলে চুলায় তেল গরম করতে থাকুন। এবং বিশেষ ভাবে শক্ত কাপড়ের চার কোনার একটা কাপড় লাগে। এই চার কোনার কাপড় টার মাঝে একটা ফুটো আছে, এই ফুটোর সাইজেই জিলাপীর ডায়া হয়ে থাকে (মোটা চিকন জিলাপীর এটাই টেকনিক)। একটা বোলে এই কাপড়টা রেখে তাতে কাই ঢেলে নিতে হবে।


এবং গরম তেলে এভাবে কাপড়ে রাখা কাই বা তরল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে দিতে হবে। এটা একটা ওস্তাদি কাজ, অভিজ্ঞতায় হাতের নিপুণতা বাড়ে।  জিলাপী বানাতে বড় চওড়া তেলের তাওয়া লাগে। যাতে করে তেলে ডুবিয়ে জিলাপী ভাজা যায় এবং তাপ সমভাবে সব জিলাপীতে লাগে।


এবার এক পাশ হয়ে গেলে অন্য পাশ উল্টে দিন।


কেমন রঙের ভাজা আপনি চান! নিজেই নির্ধারন করুন।


ভাজা হয়ে গেলে মানে সোনালী রঙ এসে গেলে তুলে চিনির সিরায় রাখুন। উঠানোর সময় জোড়া লেগে থাকা জিলাপী গুলো সাইজ মত ভেঙ্গে দিন এবং সেভাবে তুলে নিন।


তেলে ভাজা যে কোন কিছুর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা প্রয়োজন। নিদিষ্ট দুরত্বে থাকে লোহার শিক দিয়ে আমাদের আবুল বাসার ভাই জিলাপী উল্টে দিচ্ছেন এবং তুলে শিরায় রাখছেন।


ঠান্ডা চিনির সিরায় মিনিট ২/৩ ভিজিয়ে রাখুন, কিছুতেই এর বেশী সময় নয়। বেশি সময় রাখলে জিলাপী  নরম (ওদানো) হয়ে যেতে পারে।


এবার সরাসরি জিলাপী গুলো তুলে রাখার স্থানে রাখুন। গরম জিলাপীতে হাত দিতে সাবধান, গরম জিলাপী খেতেও সাবধান!


আবুল বাসার ভাইয়ের জিলাপী চলে অনেক। বেশী কিনতে হলে লাইনে দাঁড়াতে হয়!


বাসায় নিয়ে অতিথি বা নিজেরা নিয়ে বসতে পারেন। রসালো এই জিলাপী খেতে এক হাতে জিলাপী মুখে পুরুন এবং অন্য হাত থুথনির নিচে ধরুন, রস যেন মাটিতে বা ফ্লোরে না পড়ে। টিস্যু থাকলে ভাল হয়!


নিবিড় মনে জিলাপী বানাচ্ছেন আমাদের আবুল বাসার ভাই। সাথে তার অন্য দুই সহকারী কারিগর। একজনের দায়িত্ব সিরা থেকে জিলাপী উঠানো এবং কাষ্টমারদের হেল্প করা। অন্যজন জিলাপী ওজন দেন এবং কাষ্টমারদের থেকে টাকা নেন।

জিলাপী বানাতে ও খেতে কিছু বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে (আবুল বাসার ভাইয়ের পরামর্শ)।
* বেশন কিছুতেই বেশি দেয়া যাবে না, কারন এতে তেলে ভাজতে দিলেই সোনালী হয়ে যাবে। ভেজেই সোনালী রঙ্গে আনতে হবে। কালচে ও পোড়া পোড়া হবে না। কাই মিশানোটা খুব ভাল হতে হবে।
* ভেজে সিরাতে বেশি ক্ষন রাখা যাবে না, এতে জিলাপী তাড়াতাড়ি নরম হয়ে যাবে। নরম জিলাপী খেতে মজা নেই।
* চাপাচাপি করে ব্যাগে/প্যাকেটে ভরে জিলাপী বিক্রি করা চলে না, জিলাপীর ভিতরে থাকা রস যেন পড়ে না যায়।
* জিলাপী বানানোর আধা ঘন্টার মধ্যেই পেটে চালান দিলে ভাল স্বাদ পাওয়া যায়।

(ফাঁকে জিলাপীতে ভেজাল তেল চিনি দেয়া নিয়ে কথা হয় আবুল বাসার ভাইয়ের সাথে। তিনি জানালেন, তিনি কখনো কোন ভেজাল দ্রব্য তেল, চিনি কিনেন না বা ভেজালের চেষ্টাও করেন না। যারা ভেজাল দিয়ে মানুষ ঠকায় তাদের তিনি ‘অমানুষ’ বলে জানালেন। স্বাদতো মন দিয়ে বানালেই হয়ে যায়!)


এই হচ্ছে আমাদের আবুল বাসার ভাইয়ের দোকান, রামপুরা বাজারের পাশে, রামপুরা সুপার মার্কেটের নিচতলায়, বড় রাস্তার ধারে। মন চাইলে এই পথে এসে গেলে, রিক্সা গাড়ী থামিয়ে আপনিও এই জিলাপীর স্বাদ দেখে নিতে পারেন। ভাল লাগবে নিশ্চয়।

আর রেসিপি তো জেনেই গেলেন! কি চেষ্টা করবেন বাসায় একবার! নাকি আয়োজন বড় মনে হওয়াতে জিলাপী খেতে মনে চাইলে দোকানেই চলে যাবেন! আমি একবার সুযোগ পেলে বাসায় জিলাপী তৈরী করবো, কথা দিলাম এবং সেটা আবারো রেসিপি আকারে আপনাদের সামনে হাজির করবো।

৫০০তম পোষ্টে আমার প্রিয় রেসিপি প্রিয় দেশী, প্রবাসী, ভাই, বোন বন্ধুদের প্রান ঢালা শুভেচ্ছা। ইন্ডিয়ার বাংলা ভাষাভাষী যে সব ভাই, বোন, বন্ধুরা নিয়মিত আমাদের রেসিপি দেখতে আসেন, আপনাদের জন্যও অনেক অনেক শুভেচ্ছা। আগামীতে আরো আরো আমাদের দেশীয় খাবার দাবারের রেসিপি নিয়ে আসছি। আপনাদের ভালবাসায় আমরা এগিয়ে চলছি।  ব্যাটারী, বুলেট ও ব্যালটের পক্ষ থেকেও আপনাদের সালাম ও শুভেচ্ছা।

সবাই ভাল থাকুন, আনন্দে থাকুন। ভাল খাবার খেয়ে আমাদের দিন কাটুক সবার।

কৃতজ্ঞতাঃ এ কে এম আবুল বাসার, গুড ফুড গ্যালারী।

8 responses to “রেসিপিঃ জিলাপী (আবুল বাসার ভাই স্পেশাল ও ৫০০তম পোষ্ট)

  1. amader jonno onk kosto koren vi
    doa kori 🙂
    apni r apner family valo thakun khub valo

    Like

    • ধন্যবাদ মুকিত ভাই।
      আসলে আমার যদি আরো থাকত তবে আমি এই কাজেই আমার জীবন ব্যয় করতাম। এটা যে কি মজার কাজ তা বলে বুঝানো যাবে না।

      আজ আমেরিকা থেকে এক বন্ধু ফোন দিয়েছিলেন আমাকে ধন্যবাদ জানাবেন বলে। এর চেয়ে আর কি পাওনা থাকে। কিছুদিন আগে গুলশান থেকে এক ভাই ফোন করে বললেন উনার একটা ত্যাব খোলা থাকে শুধু ‘গল্প ও রান্না’র জন্য। এর চেয়ে আর কি ভালবাসা হতে পারে। আমি অভিভূত, আনন্দিত।

      শুভেচ্ছা।

      Like

  2. জিলাপী বানানো Made easy.

    আমি যেভাবে বানাইঃ

    ঊপকরনঃ

    ১। ময়দা; ১ কাপ। (২০০ গ্রাম)।
    ২। বেসনঃ ১ কাপ
    ৩। চিনিঃ ৩ কাপ।
    ৪। পানিঃ ৪ কাপ।
    ৫। একটিভ ইস্ট (yeast):১ চা চামচ।
    ৬। মোটা পলিথিনঃ ১৮” X ১৮”
    ৭। অলিভ ওয়েল (একস্ট্রা ভার্জিন বা ভার্জিন নয় তাতে তেল পুড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে) রাইস ব্রান ওয়েল হলে সবচে’ ভাল হয়, স্পন্দন ও এ সি আই ব্রান্ডের রাইস ব্রান ওয়েল বাজারে পাওয়া যায়। সয়াবিনে তেলের গন্ধ থেকে যেতে পারে জিলাপীতে।

    প্রনালীঃ

    ১। ময়দা, বেসন, ১ কাপ চিনি ও ২ কাপ পানি আচ্চা করে ফেটিয়ে, ফেটানোর শেষের দিকে ইস্ট দিন। আরো এক মিনিট ফেটিয়ে এই কাই ১০ মিনিট ঢেকে রেখে দিন।

    ২। পাশাপাশি বাকি ২ কাপ পানিতে ২ কাপ চিনি মিশিয়ে ফুটানো পর্যন্ত জ্বাল দিন, ফুটলেই নামিয়ে নিন। বেশীক্ষণ ফুটাবেন না তাহলে ঠান্ডা হলে সিরাতে ক্রিস্টাল দানা বাঁধবে।

    ৩। এবার চুলায় তেল গরম করুন।

    ৪। পলিঠিনের মধ্যে ময়দা, বেসন ও ও চিনির ১০ মিনিট রেখে দেয়া কাই ঢেলে তাকে মোচাকৃতি করুন। মোচার আগা কাঁচি দিয়ে কেটে ছিদ্র করুন।

    ৫। মোচায় চাপ দিয়ে দিয়ে জিলাপীর প্যাচ বানান কাই দিয়ে তেলে।

    ৬। বাদামী হয়ে গেলে জিলাপীগুলো সিরাতে দু মিনিটের জন্যে ডুবিয়ে তুলে ফেলুন এবং পরিবেশন করুন।

    Like

    • ধন্যবাদ ত্রিশঙ্কু ভাই।
      আপনার রেসিপিটা বেশ ভাল লাগছে। এ যে শাহী জিলাপী। আমরা সাধারণ, সাধারণ জিলাপী চাই!।যাই হোক আপনার জিলাপীর রেসিপি আমি নোট করে নিয়েছি। দেখি কোন একদিন বানিয়ে ফেলবো।

      আপনার জিলাপীর রেসিপি ভাবছি আমাদের আবুল বাসার ভাইকে দেখিয়ে তার মতামত জানতে চাইবো। দেখি তিনি কি বলেন।

      শুভেচ্ছা আপনাকে। খাবার দাবারে আপনার আগ্রহ আমার কাছে বেশ ভাল লাগে।

      Like

  3. 2 bar baniyechi…kichutei moch moche korte parchi na…oneke bole dokane mochmoche korar jonno vejal dey…vaia apni try kore dekhechen? apnar ta ei recipi te basay moch moche hoyeche?

    Like

    • ধন্যবাদ বোন।
      না আমি এখনো ঘরে বানিয়ে দেখি নাই। বাসার ভাই আমাকে যেভাবে বলেছেন সেভাবে আমি আপনাদের দেখিয়ে দিয়েছি। বাসার ভাই এভাবেই বানিয়ে থাকেন। তবে আমি নিজেও একবার দেখবো আগামীতে।

      কাই/গোলা ভাল করে ফাটিয়ে নিয়ে কিছু ক্ষন রেখে দিয়ে তার পর বানিয়ে দেখতে পারেন। তেলে ভেজে সিরাতে ছেড়ে বেশী সময় না রাখাই ভাল।

      শুভেচ্ছা। (আমি আবারো বাসার ভাইকে জিজ্ঞেস করবো।)

      Like

[প্রিয় খাদ্যরসিক পাঠক/পাঠিকা, পোষ্ট দেখে যাবার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নিম্মে আপনি আপনার মন্তব্য/বক্তব্য কিংবা পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। আপনার একটি একটি মন্তব্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে কয়েক কোটি বার। আপনার মন্তব্যের জন্য শুভেচ্ছা থাকল। অনলাইনে ফিরলেই আপনার উত্তর দেয়া হবে।]

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s