গ্যালারি

মুলা রান্না (সাধারন)


লিখেছেনঃ সাহাদাত উদরাজী (তারিখঃ ২১ নভেম্বর ২০১১, ৪:২০ পূর্বাহ্ন)

মুলা নিয়ে আজ কদিন ধরে আমার ঘুম হারাম চলছে। গত কয়েকদিন আগে একটা প্রত্রিকায় দেখলাম, উত্তর বঙ্গের কৃষকরা মূলার দাম না পেয়ে মুলা ক্ষেত থেকে তুলে নদীতে ফেলে দিচ্ছে। মূলার কেজি মাত্র পঞ্চাশ পয়সা, কোথায় কোথায়ও ক্রেতাও নাই। খবরটা বেশ হৃদয়বিদারক। একজন কৃষক যখন তার ক্ষেত ফসল ফলান তখন তার মনে কত আশা থাকে। মুলাকে তিনি আপন ভেবে চাষ করেছিলেন, কিন্তু একি! আসলে আমার মনে হয়, এটা আমাদের সমাজেরই আরো একটা বাজে দিক। আমরা কিছুই যেন আপন করে নিতে পারি না! মূলার ও মুলা শাককেও আমরা কিছুতেই আপন করে নিতে পারলাম না। উচ্চফলনের এবং কম সময়ে বেশ বড় হয়ে যাওয়া এই ভেজসকে আমারা কিছুতেই আমাদের কাছাকাছি আনতে পারলাম না।

অথচ এই মুলা তরকারী কত স্বাদু। কত প্রকারেই না আমরা এই মুলা খেতে পারি! মুলা যে কোন মাছ দিয়ে রান্না করা যায়, মুলা দিয়ে গরু, খাসী ও মুরগীর গোসত রান্না করা যায়। আলুর বিকল্প হিসাবে আমরা মুলা যে কোন তরকারীতে দিয়ে দিতে পারি। মুলা দিয়ে বানানো সালাত বেশ ভাল হয়। অথচ দেখুন, বাংলার প্রতিটা ঘরে মুলা নিয়ে আছে নানা রম্য কাহিনী! মুলাকে ছোট বেলা থেকেই আমাদের মনে বিষিয়ে রাখা একটা তরকারী হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। মুলা গাধার খাদ্য, মুলা খেলে লেপ গরম থাকে, মুলায় গ্যাস হয়, বাতাস হয় এই রকম আরো কত কি! মুলা যারা খায় তাদেরো খুব একটা ভাল চোখে দেখা হয় না। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে মূলার জনপ্রিয়তা একে বারেই নেই। স্বামীরা স্ত্রীদের ভয়ে মুলা কিনে না বললেই চলে! সে যাই হোক, মুলা নিয়ে অনেক কথা বলা যাবে। গাধা মুলা দেখেই সামনে এগিয়ে যায়!


হা, আমি নিজেও অনেক বছর মুলা কিনি নাই। বিবাহিত জীবনের চৌদ্দ বছরে হাতে গনা তিন চার বার কিনেছি বলে মনে হয়। মুলা নিয়ে বাসায় যেতে ভয় হয়! মুলা আমার ব্যাটারীও এজ ইট ইজ পছন্দ করেন না! গত কয়েকদিনের পত্রিকায় দেখে, মায়ায় এবং আমার মা বাসায় আছেন ভেবে গতকাল আমি অফিস থেকে ফেরার পথে মুলা কিনতে বাজারে প্রবেশ করি। আমি বাজারে গিয়ে মূলার দাম দেখে অবাক হই, বিশ টাকা কেজি (কোথায় যেন একটা ফাঁকি রয়ে যাচ্ছে, আমাদের কৃষকরা নায্য মুল্য পাচ্ছেন না)। তার উপরে বড় মুলাও নেই (মাকে ফোন করে বলেছিলাম, খুব সাধারন ভাবে আমাকে মুলা তরকারী রান্না শিখিয়ে দেবার জন্য)। যাই হোক, আমরা ‘মা ও ছেলে’র সাধারন মুলা রান্না দেখুন। আমার আম্মাকে আমরা রান্নাঘরে যেতে দিতে চাই না। কিন্তু কোন আমার মনে হয়েছে, তার কাছ থেকে এই সাধারন রান্না গুলো শিখে নেয়া দরকার। কত সহজ দেখুন।

আমার আম্মা প্রসঙ্গে একটু না বললেই নয়। এক সময় আমার আম্মা বইপত্র/পেপার পড়ার পোকা ছিলেন। এখনো তিনি শুয়ে পত্রিকা পড়েন এবং তার পত্রিকা পড়ার ভঙ্গিই বলে দেয় তার সাথে পত্রপত্রিকার কি সম্পর্ক। আমি রেসিপি লিখি জেনে হেসে বলেছিলেন, অফিস আদালত করে এই সব লিখার সময় পাস কোথায়? আমার কয়েকটা প্রিন্ট রেসিপি তিনি পড়েছেন। আমি অবশ্য আর কিছু জানতে চাই নাই! খুব ছোট বেলা থেকেই তার সাথে আমার সম্পর্ক একটু অন্য ধরনের, আমার যত আবদার তার কাছেই ছিল। আমি মনে করি তিনি আমাদের তিন ভাইদের মধ্যে আমাকে একটু বেশী বেশী আদর করেন। আমার জন্য দোয়া করেন। আমিও তার জন্য আছি। তার জন্য অনেক সময় অনেক কিছু করতে পারি নাই সত্য তবে আমার জান কোরবান আছে। তার শেষ সময়ে আমি তার কাছে কাছে থাকতে চাই। আমার এই রান্না জানাটা হয়ত সে দিন ভাল করে কাজে লাগবে।

উপকরণঃ
– মুলা (কেজি খানেক, মুলা কাটায় একটা সৌন্দর্য আছে। যেন তেন ভাবে মুলা কাটলে খেতে ইচ্ছা হয় না।)
– যে কোন জিওল মাছ কয়েকটা বা কয়েক টুকরা (শোল মাছ দিয়ে নাকি বেশী স্বাদ হয়)
– পেয়াজ কুচি ( কয়েকটা)
– রসূন বাটা (এক চা চামচ)
– মরিচ গুড়া (এক চা চামচ)
– হলুদ গুড়া (এক চা চামচ)
– তেল (পরিমান মত)
– কাঁচা মরিচ কয়েকটা
– লবন
– ধনিয়া পাতা

প্রণালীঃ

মুলা কেটে ভাল করে ধুয়ে সিদ্ব করে পানি ফেলে নিন। বেশী সিদ্ব নয়, অর্ধেক সিদ্ব টাইপ। সিদ্ব করে পানিতে আবার ধুয়ে নিলে মূলার ঘ্রান নষ্ট হয় ও রং উজ্জ্বল হয়।


হাড়িতে তেল গরম করে পেয়াজ কুচি দিয়ে ভাল করে নাড়িয়ে তাতে রসূন, মরিচ, হলুদ ও লবন দিয়ে ভাল করে কষিয়ে নিতে হবে।


দুই টুকরা মাছ দিয়ে দিন। মাছ এক সময় ভেঙ্গে যাবে (চাইলে কাঁটা তুলে নিতে পারেন), এখানে মাছ দেয়া হয় স্বাদ বাড়ানোর জন্য। সাধারণত যে কোন জিওল মাছ দিলে স্বাদ নাকি বেশী হয়। আমাদের সে দিন জিওল মাছ না থাকায় আম্মা বললেন, তেলাপিয়া মাছের টুকরাই চলবে।


এক কাপ পানি দিয়ে ঝোল বাড়িয়ে ভাল করে কষিয়ে সিদ্ব মুলা ছেড়ে দিন।


কত সুন্দর সাদা মুলা!


কয়েক কাপ পানি (গরম হলে ভাল হবে) দিয়ে ভাল করে জ্বাল দিন। মিনিট বিশেক ঢাকনা দিয়ে জ্বাল চলতে পারে। মাঝে মাঝে নেড়ে দিতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন, মুলা গলে বা ভেঙ্গে না যায়। এই সময় কয়েকটা কাঁচা মরিচ দেয়া যেতে পারে।


মুলা নরম হয়ে গেলে লবন দেখে নিন। লাগলে দিন না লাগলে ওকে বলুন। নামাবার আগে পরিমান মত ধনিয়া পাতা দিন।


ব্যস হয়ে গেল সাধারন মুলা রান্না। পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত।

অনেক মজাদার রান্না হয়েছিল। এই মুলা রান্নার ফাঁকে আম্মা থেকে আমি আরো একটা সাধারন রান্না শিখে নিয়েছি। তা হল সীম আর আলু মিশিয়ে সাধারন ভাজি। এটাও আমার কাছে খুব সহজে ও কম সময়ে ভাল ভাজি মনে হয়েছে। আপনাদের আগামীতে দেখাব। যাই হোক, মুলা রান্না শেষ করার আগেই আমার ছেলে রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছিল। মুলা রান্না শেষ হতেই আমি তাকে একটা বাটিতে কয়েক টুকরা মুলা নিয়ে দেই, স্বাদ দেখার জন্য। ও খেয়ে বলল, ভাল হয়েছে।

Advertisements

One response to “মুলা রান্না (সাধারন)

  1. পিংব্যাকঃ রেসিপিঃ কচি মূলা ও শুঁটকী (একান্ত ব্যক্তিগত রান্না) | রান্নাঘর (গল্প ও রান্না)

[প্রিয় খাদ্যরসিক পাঠক/পাঠিকা, পোষ্ট দেখে যাবার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নিম্মে আপনি আপনার মন্তব্য/বক্তব্য কিংবা পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। আপনার একটি একটি মন্তব্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে কয়েক কোটি বার। আপনার মন্তব্যের জন্য শুভেচ্ছা থাকল। অনলাইনে ফিরলেই আপনার উত্তর দেয়া হবে।]

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s