গল্প ২, আমি ও জেলখানা


আমি জামশেদ ইসলাম, পড়ছি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে, চতুর্থ সেমিষ্টার শেষ হল কয়দিন আগে। আমার জ্ঞান বুদ্ধি ভাল, মোটামুটি আমাকে ভাল ছাত্র বলা যায়, তবে রেজাল্ট আহমরি কিছু হয় না, টেনে টুনে পাশ দিয়েই যাচ্ছি, অবশ্য এর বাইরে আর কি বা হবে! আমি চাকুরী করবো না সিদান্ত নিয়েছি, টুকটাক ব্যবসা করে বাঁকা কোমর দাঁড়া করাবো। এদিকে যদি সফল না হই তবে বিদেশে চলে যাব!

আমার বড় ভাই মোরশেদ ইসলাম ইটালীর নাগরিক, তিনি দুইহাজার নয় সালের দিকে লিবিয়া থেকে পানি পথে বিরাট যুদ্ধ করে ইটালী পৌঁছেছিলেন এবং অনেকদিন নিরুদ্ধেস থাকার পর ইটালীর নাগরিক হয়ে আবার উদ্ধিত হন! তখন থেকেই তিনি আমাদের পরিবারের সব কিছু এবং এই সময়ে তিনি বেশ ধনী হয়ে উঠেন, বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে প্রতি মাসে অনেক টাকা পাঠান এবং সেই সুত্রে আমরা আমাদের গ্রামের বাড়ী পাকা দোতালা হয়ে যায় এবং আমাদের আই মিন আমি সহ ছোট ভাই বোনদের জীবন পাল্টে যায়। আমাদের আর ক্ষেতে খামারে কাজ করতে হত না! এমন কি আমরা আর কোন দিন গরুর ঘাস কাটি নাই, মাঠে ছাগল চরাই নাই!

পরিবারের অন্যদের নিয়ে অনেক গল্প আছে, সেই সব আজ আর করছি না! এখন আমাদের পরিবারে আনন্দ আর আনন্দ। জমি জমা বর্গা, ভাইয়ের টাকা সব মিলিয়ে আমরা বেশ আছি। আমি ভাইয়ের টাকায় এখন পড়ছি, আগেই বলেছি আমি নর্থ সাউথ ইউনিভারসিটির ছাত্র! যাই হোক, আমার বড় ভাই আমার বাবার অনুমতি নিয়েই ইটালীতে বিবাহ করেছিলেন, পাত্রী ফরিদপুর অঞ্চলের একজন ভদ্র মেয়ে। যতদুর আমি জেনেছি, উনার বাবা বহু বছর আগে ইটালীর নাগরিক হয়ে পরে উনাদের ইটালী নিয়ে গিয়েছিলেন এবং এখন উনারা সবাই ইটালীর নাগরিক। বট ভাইয়ের সাথে সেখানে দেখা এবং প্রেমে পড়া, পরে বিবাহ এবং আমাদের ভাবী!

আমাদের এই বড় এবং ভালবাসার ভাবী গত মাস দুয়েক আগে বাংলাদেশে এসেছেন, সাথে দুইটা পিচ্ছি, ৪/৪ বয়স, কিউটের ডিব্বা, আমার ভাতিজিদ্বয়, ওরা জমজ। মাস খানেক থেকে বড় ভাই ইটালী ফিরে যান, ভাবী ও বাচ্চাদের আমাদের কাছে রেখে যান। আমি চাচ্চু হিসাবে এই দুই কিউটের ডিব্বার সাথে বেশ জড়িয়ে পড়ি। বলা চলে ওয়াস রুমের কিছু সময় ছাড়া আমি এই মাস খানেক ওদের আলগে রেখেছি। ওরাও আমার মত চাচ্চু পেয়ে বেশ আনন্দিত। ওমা ওরা কি ঢং ঢাং করছে আজকাল। প্রথম মাসে ওরা তেমন বাংলা বলতে না পারলেও, পরের দিন গুলোতে ওদের আমি নিজেই বাংলা শিখিয়েছি, আগে কাউকে দেখলে মুখ লুকিয়ে ফেলত, আমি ধীরে ধীরে ওদের সেই অভ্যাস দুর করেছি। আজকাল ওরা কি সুন্দর করে বাংলা বলে, প্রান জুড়ে যায়! আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, বাংলা ভাষা শিশুদের মুখেই বেশী সুন্দর, বুড়োদের চেয়ে!

আজ সকালে আমার এই ভাবী ও ভাতিজিদ্বয়ের ফ্লাইট ছিল, ওরা ফিরে যাচ্ছে। আমার খুব ভালবাসা ওদের জন্য, দুইটারে দুই কাঁধে/কাখে নিয়ে ভাবীর পিছে পিছে আমি এগিয়ে চলছি। বলে রাখি, ওরা খুব চঞ্চল, একটা উত্তরের মেয়র তো অন্যটা দক্ষিনের, একটা আতিক তো অন্যটা তাপস! ভাবী একা ওদের সামলে এমিরাটসের কাউন্টার ও ইমিগ্রেশন পার হতে পারছিলেন না, সাথে ওদের মায়া কান্নাতো ছিল! ফলে আমিও বিমান কাউন্টার সহ ইমিগ্রশন এরিয়াতে প্রবেশ করে ফেলি! ঘটনা এই রকম, প্রথমে লাগেজ দিয়ে ভাবীর পিছে পিছে ওদের কোলে নিয়ে ইমিগ্রশন চেকে চলে যাই, ইমিগ্রেশনের পুলিশ মামা মনে হয় আমাকে ওদের বাবা মনে করছিলো, আমাকে কিছু বলে নাই, আমিও সামনে চলে যাই। এখানে আমি সামান্য একটা অতি চালাকি করছি, যা আপনাদের বলতে ভুলে যাচ্ছি! হ্যাঁ, আমি আমার পাসপোর্ট টা নিয়ে এসেছিলাম এবং তা বুক পকেটে সেট করেছিলাম। এই পাসপোর্টের জন্য আমাকে কারো সন্দেহ হচ্ছিলো না!

যাই হোক, ভাবী ও বাচ্চাদের ফ্লাইট এটেন্ড মানে লাষ্ট এরিয়তে দিয়ে আমি টারমিনাল ঘুরে দেখার সিধান্ত নেই এবং গেইট নং গুলো দেখে দেখে এগুতে থাকি। আমার কাছে এটা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল মনে হচ্ছিলো! আমি যদিও পাসপোর্ট বানিয়েছি, এখনো কোন দেশে যাই নাই, শুধু মনে মনে ভাবছিলাম, একবার ইন্ডিয়ার কলকাতা দেখে আসবো, যতদুর জেনেছি ওরাও নাকি বাংলায় কথা বলে, আহ! বিদেশে যেয়েও বাংলায় কথা শোনা যাবে!

ঠিক এই সময়ে কিছু সিভিল পুলিশ (এটা আমার অনুমান) আমাকে আটকে দিল, আমাকে একটা রুমে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলো। আমার কোন কথাই ওরা মানতে চাইছিলো না, আমি যাই বলি তাতেই ওদের সন্দেহ, কেহ কেহ আমাকে জঙ্গীও বলে দিল, আমি নাকি বিরাট নাশকতা করতে বিমান বন্দরে প্রবেশ করেছি। এই গোলামের পুতদের কাছে ভালবাসার কোন মুল্য নেই! সত্যের কোন ভাত নেই!

ঘটনা আর টানতে ইচ্ছা হচ্ছে না। প্রায় ঘন্টা পাঁচেক বসিয়ে আমার বিচারের ব্যবস্থা করা হল, অনেকটা ভ্রাম্যমান আদালত। এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রড এলেন, সব শুনে আমার ৭ দিন জেল বা কারাদন্ড দিয়ে দিলেন! হ্যাঁ, আমাকে কিছুক্ষনের মধ্যেই এশিয়ার বিখ্যাত কেরানীগঞ্জ জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হবে!

জেলখানা আমি কেমন দেখবো, সেটা পরে আপনাদের ভিন্ন লেখায় জানাবো! আপাতত গলাটা বেশ শুকিয়ে যাচ্ছে, এক গ্লাস পানি পেলে মন্দ হত না!

প্রিয় ভাতিজীদ্বয় তারিন জারিনদের প্লেন নিশ্চয় এখন অনেক আকাশে!

https://www.facebook.com/udraji/posts/10214048615244364