গুলনাহার সাহাবউদ্দিন নামাঃ সাহাদাত উদরাজী


গুলনাহার সাহাবউদ্দিন নামাঃ সাহাদাত উদরাজী

১।
একটা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে
কুটকে বসে আছি এক কোনার সোফায়।
পত্রিকা পড়ছিলাম, আশে পাশে খেয়াল নেই
হঠাৎ ছুঁড়ির শব্দে পত্রিকা থেকে দুইচোখ সামনাসামনি-

একটা গাত্তা মেয়ে বসে আছে
ভীষন রিস্টপুস্ট দেহ, গোলগাল মুখ, চোখে মায়াবি হাসি,
ছুঁড়ি গুনছিলেন, দুই হাতে মেহেদির উল্কি,
সাজগোজ আহামারি নয়, আমার দিকে নজর নেই।

আমার শরীর স্থির, মন অস্থির হলো
নেড়ে চেড়ে বসি আমি- সেই আমাদের প্রথম চোখাচুখি।
আমি বিবাহিত, বিবাহের আঠার বছর কদিন আগে হয়েছে-
কিন্ত এ প্রথম মনে হল আমার অনেক কিছু বাকি!

জন্মদিনের কেক কাটা হল
সারাঘর ভর্ত্তি লোকজন, এখানে ওখানে জটলা
সবাই ব্যস্ত একে ওকে নিয়ে, আমার দুই চোখে শুধুই সে
আমি তাকেই খেয়াল রাখছি, সেও আমাকে!!

কেমন যেন তার ভাব, সে কি আমার প্রসঙ্গে জানে আগে!
নাকি ধরে নিচ্ছে – একটা নুতন প্রেম পাগলা!
তার চোখের ভাষায় আমি খই হারাছি – বসে ভাবছি,
হঠাৎ কাছে আসে, আপনার পরিচয়?

তখন অনেকে বিদায় হয়েছে, মুষ্টিমেয় ক’জন এদিক সেদিক
নাম বলি, ঘরে বউ আছে এসে যায় অপ্রসংগিক ভাবে,
নাম জিগেস করি, হায় তারও স্বামী আছে!
যদি আমাদের প্রেম হয় – তা হবে পরকিয়া!

২।
পরদিন সকালে, অফিস পথে রিকশায়
অপরিচিত নাম্বার থেকে হাতে থকা মোবাইল বাজে,
হ্যালো শুনছেন! আমি গুলনাহার, ছুড়ির শব্দে তাকিয়ে ছিলেন গতরাতে!
আপনি কি সাহাবুদ্দিন? ইথারে আমার প্রথম জবাব – হ্যাঁ।

আসলে আমিও গতকাল রাতে গুলনাহারকে ভেবেছি,
পাশে আমার প্রিয়তমা পত্নী রেখেও,
কি চমৎকার গুলনাহারের চোখ, শরীর –
এও ভেবেছি বহুবার – গুলনাহার যদি আমার বউ হত!

গুলনাহার হ্য়তো আমাকে ভেবেছেন,
দাগ কেটেছে আমার কথা তার মনে!
নয়তো এমন করে আমার নাম্বার যোগালো কিভাবে?
রিকশা এগিয়ে চলছে!

গুলনাহার ফোন এ কথা বলেই যাচ্ছেন
এক পর্যায়ে বললেন- গতকাল রাতে আমাকে ভেবেছেন?
আমি হাসি, গুলনাহার আমায় হাসি থামাতে বলেন-
আসুন না আজ বিকালে কোথায় ও!

ন’টা পাঁচটার অফিসে আজ কোন কাজ হল না,
গুলনাহারের ভাবনা মাথায় – কখন ছ’টা বাজেবে!
যথা সময়ে গুলনাহার গুনগুন করে এলেন মৌছাকে
দেখা হতেই বলেন – অনেকক্ষন দাড়িয়ে বুঝি!

গুলনাহার আধা ঘন্টা লেট, মুখে শলাজ হাসি-
রাস্তার জ্যামের কথা বলেন, আমি মানি।
সন্ধায় মুয়াজিন মসজিদে আযান দেন –
আমরা দুইজন একটা রিকশায় উঠি – গন্তব্যহীন।

রিকশা তখন কাকরাইল, শিল্পকলা হয়ে,
ইঙ্গিনিয়ারিং ইন্সিটিউট, শিশুপার্ক ঘেসে শাহবাগ মোড়ে।
টিএসসির দিকে – একটা হাল্কা হাওয়া,
গুলনাহারের লম্বা কালোচুল আমার মুখ ডেকে যাওয়া।

সেই প্রথম পরশ, সেই প্রথম ঘ্রান
বেলি ফুলের সুবাসে ভরা শ্যাম্পু দিয়ে
আজ গোসল সেরেছেন গুলনাহার –
আমার চোখ দুটো মুজে আসে।

গুলনাহার রিকশা থামালেন রোকেয়ার সামনে,
হাকিম মিয়া চত্তরের খোলা দোকান থেকে
কিছু ভুজিয়া কিনলেন – ডানে এগুলেন
রাস্তায় ঠং মেলে বসতে বলেন ফুটপাতে।

সুবোদ বালক হলাম আমি!
তিনি যেন আমার প্রিয় দেশনেত্রি, জননেত্রি
তিনি টানা বলেই চলছেন- আমি নির্বাক শোতা
মাঝেমাঝে অঙ্গ দুলাছেন, যেন বাংলাসিনেমার উর্থি নায়িকা!

দশটা বাজার কিছু আগে তিনি তৈরি হলেন,
চলে যাবেন – ঘরে স্বামী আছেন একা!
আমি ও রাজি হই – প্রস্তাব দেই,
এভাবে হউক না প্রতিদিন একবার দেখা!

৩।
গুলনাহার এভাবে আমাকে নিয়ে বের হন,
কখনো প্রতিদিন, কখনো দু’চার দিন পর
বেলি ফুলের আকর্ষনে প্রায় দিশাহারা আমি
চলছে চলুক না এ জীবন, জীবনটা!

মাসখনেক আমি গুলনাহার কে নিয়ে ঘুরেছি,
দেখেছি সমগ্র ঢাকা –
আমাদের মাঝে তখন বেশ ভাল বুঝাপড়া
পত্নীকে প্রায় ভুলতে চলেছি – বিয়েটা মনে হয় বিরাট ঝামেলা!

একদিন সন্ধায় আমরা দুইজন বুড়িগঙ্গায়,
আকাশে রুপালি চাঁদ – পানি ঝিকিমিকি
সমগ্র পৃথিবী মনে হছে হাতের মুঠায়
কেমন একটা কাব্বিক ভাবনা আমার মাথায়।

কবি হওয়া কঠিন জানতাম আমি,
সে প্রথম মনে হল – এ কাজ ভারি সোজা!
আর বুঝলাম কবিদের রচনা-
সব শালা কেন কবি হতে চায়!

৪।
একদিন মামা হালিম খেতে খেতে
গুলনাহার বলেন – আপনাকে জানা হল না পুরো!
আমি বলি – আর কি থাকল বাকি?
আমি শুধু আপনাকে ভালবাসি ভালবাসি।

গুলনাহার পেয়ালা খালি করে বলেন,
আপনাকে বিছানায় জানতে চাই-
মুখে তার নিমছে হাসি, মনে হচ্ছে পুর্নচাঁদ
কপালে কাচা মরিচের ঝাল, বিঁন্দু বিঁন্দু।

৫।
ক’দিন ধরে গুলনাহারের খোঁজ নাই
মনটা বেজায় খারাপ, কোথায় প্রিয় গুলনাহার!
কোথায় কি হল ভূল, নাকি অসুস্থ্য
ফোন করি- সংযোগ পাচ্ছে না, জবাব নাই।

একটা কস্টে আমার দিন কাটে, রাত আসে
আমার পত্নী বলেন- কি হল মিস্টার, এমন জুবুতুবু!
সব কথা সবাই কে বলা যায় না,
বিশেষত- পত্নী এবং পুলিশ, একই কাতারের!

৬।
প্রায় দশ দিন পর আবার
প্রিয় গুলনাহার ফোন করলেন- হ্যালো!
আনন্দে দিশাহারা আমি
কোথায় আছেন, আছেন কি ভালো?

সেলফোনটা হারিয়ে ফেলেছিলাম,
এছাড়া চলছিল মাসের বিশেষ দিন!
একটুও সুযোগ হয়নি তাই-
বিশেষ ভাবে ক্ষমাপ্রাথী।

গুলনাহারের ক্ষমা চওয়াটা চমৎকার,
কাছে পেলে হয়ত বলতেন- নাক টেনে
আর এমন হবে না জনাব সাহাবউদ্দিনসাহেব
দেরিতে এসে এমন বলেছেন বহুবার গুলনাহার।

৭।
গুলনাহারকে বিকালে বনশ্রীর খোলা মাঠে!
দু’জন হাটলাম অনেকক্ষন এক হয়ে
মাঝে নৌকা চড়লাম দুজন,
দুরগন্দে ভরা এক মরা নদী এ শহরে!

ভর সন্ধ্যায় চা খেলাম টং দোকানে
একটা খালি প্লট – সবুজ ঘাসে ঢাকা
ঠিক মদ্দখানে বসলাম, গুলনাহার আমার বুকে মাথা রাখেন
চিৎ হয়ে শুয়ে বলেন- আসেন আকাশের তারা গুনি।

এক ফাঁকে গুলনাহার আমার হাত
তার পেটের উপর রাখেন।
আমি শিহরিত, বুঝি দেড় ইঞ্ছি মেদে ডাকা
লিলামে উঠা- যেন কোন বৃহত নদীর পাঙ্গাশ!

৮।
কিছুদিন পর গুলনাহার ফোন দিলেন
আজ রাতে সরাসরি চলে আসবেন- দাওযাত
আপনার জন্য নুতন কিছু থাকবে! আরো থাকবে
আপনার প্রিয় সাদাভাত, বানাবো টাকি ভর্ত্তা!

একটা উতলা বাসনা,
দুই দেহের কারশাজি
মুখোমুখি মাখামাখি
লাফালাফি ঝাপাঝাপি।

৯।
মাস খানেক গত হলো, গুলনাহারের খবর নেই
ফোন বন্ধ- আমি নিজেও অবাক, ভুল হলো কি?
আবার ভাবি, যাই দেখে আসি
স্বামী সক্রান্ত বিষয়ে আবার ঝিমিয়ে পড়ি।

১০।
আজ দুপুরের অলস সময়ে, অফিসের চেয়ারে দুলে আছি
হঠাৎ ফোন বাজে উঠলো, মিসেস গুলনাহার!
কুশলাদি বিনিময় হলো- মাঝ পথে বলেন
আপনার আর প্রযোজন নেই! আমি অবাক!

আপনার কাছে যা চাওয়ার ছিল
তা পেয়ে গেছি!
মা হওয়ার ইচ্ছে ছিল

তা আমি ধারন করে চলেছি!

প্রথম প্রকাশঃ আমরা বন্ধু http://www.amrabondhu.com/udraji/1068
সাহাদাত উদরাজী | এপ্রিল ২৮, ২০১০ – ৫:৩২ অপরাহ্ন (আমরা বন্ধু ব্লগে লেখা)

(মুলত এটা আমার প্রথম কবিতা প্রকাশ, এটা লিখে আমি প্রথম অনলাইনে প্রকাশ করেছিলাম। আমরা বন্ধু ব্লগে এটা মনে হয় এখনো সেরা পাঠিত কবিতা। আমি তখন সবে মাত্র অনলাইনে বাংলা টাইপ শিখেছিলাম, অভ্র দিয়ে। এবং এই কবিতায় (!) অনেক বানান ভুল আছে, পরে পাঠকদের জন্য সেই বানান আর সঠিক করা হয় নাই। এই কবিতার মুল ভাব যদি আনন্দ পেয়ে থাকেন, তবেই সার্থক!)